• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৯

তাজমহলের বন্ধ পাতালঘরগুলোতে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে?

প্রকাশিত: ০৯:৩৬, ১৬ মে ২০২২

ফন্ট সাইজ
তাজমহলের বন্ধ পাতালঘরগুলোতে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে?

তাজমহলের ভূগর্ভস্থ ওই কক্ষগুলো ১৯৭৮ সালের এক বন্যার আগপর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি ভারতের আগ্রার তাজমহল। সম্প্রতি হিন্দুদের দেবদেবীর মূর্তির সম্ভাব্য উপস্থিতি পরীক্ষা করা ও 'আসল ইতিহাস জানার' জন্য তাজমহলের ২২টি রুদ্ধদ্বার কক্ষ খোলার নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মিডিয়া ডেস্কের ইনচার্জ রজনীশ সিং। কিন্তু বৃহস্পতিবার (১২ মে) তার আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষ্ণৌ বেঞ্চ।

রজনীশ সিং আদালতকে জানিয়েছিলেন, তিনি- 'তাজমহলের ওই কক্ষগুলোতে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি মন্দির ছিল'- ঐতিহাসিকদের এ দাবির সত্যতা যাচাই করতে চেয়েছিলেন।

মোগল সম্রাজ্ঞী মমতাজ তার ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। নিজের স্ত্রীর স্মৃতি অক্ষয় রাখতে সম্রাট শাহজাহান আগ্রার যমুনা নদীর তীরে ১৭ শতকে তাজমহল তৈরি করেন। চোখধাঁধানো রূপের তাজমহল তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছিল ইট, লাল বেলেপাথর, ও সাদা মার্বেল পাথর। কালের আবর্তে এখনো সগর্বে আগ্রার তীরে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের অন্যতম এই পর্যটক আকর্ষিক স্থাপনা।

রজনীশ সিং যে বন্ধকক্ষগুলোর কথা বলছেন, সেগুলো তাজমহলের ভূগর্ভস্থ কক্ষ। যদি এ স্থাপনাটি নিয়ে সবচেয়ে গোঁড়া ধারণাগুলোও বিবেচনায় আনা হয়, তাহলেও তাজমহলের আদত ইতিহাস নিয়ে কারও মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার কথা নয়।

মোগল স্থাপত্যরীতি নিয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখেন ইউনিভার্সিটি অভ ভিয়েনার এশিয়ান আর্ট বিভাগের অধ্যাপক এবা কচ। তাজমহল নিয়ে তার প্রমাণসিদ্ধ লেখাও রয়েছে। নিজের গবেষণার সময় তিনি তাজমহলের ওই ঘরগুলো এবং বারান্দা প্রদর্শন করেছিলেন, ছবিও তুলেছিলেন।

কক্ষগুলো মূলত ছিল একটি তাহখানার অংশ। মোগল স্থাপত্যরীতিতে তাহখানাগুলো তৈরি করা হতো গ্রীষ্মকালে ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য। যমুনা নদীর দিকে মুখ করে থাকা তাজমহলের একটি চত্বরে এরকম কয়েকটি সারিবদ্ধ কক্ষ রয়েছে। এবা কচ এ ধরনের ১৫টি কক্ষ খুঁজে পেয়েছিলেন।

তাজমহলে সাতটি বিশাল কক্ষ ছিল যেগুলো আবার দুপাশে কুলুঙ্গির মাধ্যমে বড় করা হয়েছিল। ছয়টি মোটামুটি বর্গাকৃতির কক্ষ, এবং দুইটি অষ্টভুজাকৃতি কক্ষও ছিল। 'সম্রাট, তার স্ত্রীগণ, ও সমভিব্যাহারীরা যখন সমাধিটি ভ্রমণ করতেন, তখন এ ঘরগুলো নিশ্চয়ই বেশ আলোবাতাসপূর্ণ ছিল। এখন আর এগুলোতে প্রাকৃতিক কোনো আলো প্রবেশ করতে পারে না,' বলেন অধ্যাপক এবা কচ।

মোগল স্থাপত্যরীতিতে এরকম ভূগর্ভস্থ গ্যালারি প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। পাকিস্তানের লাহোর শহরে অবস্থিত একটি মোগল দুর্গে জলাশয়মুখী এরকম অনেকগুলো কক্ষের সারি রয়েছে।

তাজমহলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে শাহজাহান প্রায়ই যমুনা নদীর ওপর দিয়ে নৌকায় চড়ে আসতেন। প্রশস্ত ঘাট পার হয়ে তিনি স্ত্রীর সমাধিস্থলে প্রবেশ করতেন। 'তাজমহলে ঘুরতে গিয়ে ওই সুন্দর নকশাকাটা বারান্দাগুলো দেখার কথা আমার এখনো মনে আছে। সেই বারান্দা শেষ হয়েছে একটি বড় চত্বরের সামনে এসে। স্পষ্টই বোঝা যায় স্বয়ং সম্রাট এ বারান্দা ধরে হাঁটাচলা করতেন,' বলেন ভারতীয় কনজার্ভেটর অমিত বাগ। বছরকুড়ি আগে তিনি তাজমহল ভ্রমণ করেছিলেন।

আগ্রায় জন্মগ্রহণকারী দিল্লিকেন্দ্রিক ইতিহাসবেত্তা রানা সাফভি'র তথ্য অনুযায়ী, তাজমহলের ভূগর্ভস্থ ওই কক্ষগুলো ১৯৭৮ সালের এক বন্যার আগপর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। 'বন্যার পানি তাজমহলের ভেতরে ঢুকে যায়, অনেকগুলো পাতালঘর কাদামাটিতে ভরে যায়, কোনো কোনটাতে ফাটলও ধরে। এরপর থেকে কর্তৃপক্ষ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ওই ঘরগুলো বন্ধ করে দেয়। ওগুলোর ভেতরে কিছুই নেই,' বলেন তিনি। এই ঘরগুলো সংস্কার কাজের জন্য সময়ে সময়ে খোলা হয়।

অন্যসব আশ্চর্যকর বস্তুর মতো তাজমহলকে নিয়েও নানা মিথ আর কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। এই যেমন অনেকে মনে করেন শ্বেতপাথরের তাজমহলের বদলে শাহজাহান আসলে কালো তাজমহল তৈরি করতে চেয়েছিলেন; তাজমহল কোনো এক ইউরোপীয় স্থপতির দ্বারা তৈরি হয়েছিল।

অনেক পশ্চিমা পণ্ডিত তর্ক করেছেন এ বলে যে, ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজে নারীদের অবস্থান যে অধস্তন পর্যায়ে ছিল, তা-তে মনে হয় না কোনো নারীর জন্য এরকম স্থাপনা কেউ তৈরি করবেন। অবশ্য ইসলামী বিশ্বে অন্যান্য নারীদের জন্যও যে সমাধিস্তম্ভ রয়েছে তা তারা ভুলে যান।

তাজমহল দেখতে আসা ভ্রমণপিয়াসীদের গাইডদের মুখ থেকে নিয়মিতই শুনেন কীভাবে শাহজাহান তাজমহলের স্থপতি ও নির্মাতাদের কাজ শেষ হওয়ার পরে হত্যা করেছিলেন সে মিথ।

ভারতে তাজমহল সম্পর্কিত একটি দীর্ঘকালীন মিথ হলো এটি আদিতে একটি শিবমন্দির ছিল। ১৭৬১ সালে সরজ মাল নামের এক হিন্দু রাজা আগ্রা দখল করে নেওয়ার পরে তার সভার একজন পুরোহিত নাকি তাজমহলকে হিন্দু মন্দিরে পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভারতের ইতিহাস নতুন করে লেখার জন্য ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা পিএন ওক তার বইতে দাবি করেছেন তাজমহল একটি শিবমন্দির ছিল।

২০১৭ সালে সঙ্গীত সোম নামক বিজেপি'র একজন নেতা তাজমহলকে ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর একটি 'কলঙ্ক' হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে এটি 'বেইমানদের দ্বারা নির্মিত' হয়েছিল। এ সপ্তাহে দিয়া কুমারী নামের বিজেপির আরেকজন নেতা বলেছেন শাহজাহান এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের 'জমি দখল' করে সেখানে তাজমহল বানিয়েছেন।

রানা সাফভি'র মতে গত কয়েক দশকে ডানপন্থীদের একটি অংশের কাছে নতুন মাত্রা পেয়েছে এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলো। এবা কচের ভাষায়, তাজমহলকে নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখার চেয়ে গল্পগাছাই বেশি হয়েছে।

বিবিসি থেকে অনূদিত

বিভি/এনএম

মন্তব্য করুন: