• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শিমু হত্যাঃ কিছুই টের পায়নি ফ্ল্যাটে থাকা সন্তানরা

প্রকাশিত: ০৯:২৩, ২০ জানুয়ারি ২০২২

আপডেট: ১০:৫৯, ২০ জানুয়ারি ২০২২

ফন্ট সাইজ
শিমু হত্যাঃ কিছুই টের পায়নি ফ্ল্যাটে থাকা সন্তানরা

স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেল-এর হাতে অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু খুনের পেছনে দাম্পত্য কলহের বিষয়টি সামনে এলেও স্বজনরা এখনও জানেন না, কী নিয়ে তাদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব ছিলো। এমনকি হত্যাকাণ্ডের সময় ছেলে-মেয়েরা ওই বাসায় থাকলেও তারা কিছু টের পাননি। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকতেন ৪০ বছর বয়সী এ অভিনেত্রী।

শিমু-নোবেল দম্পতির সন্তানদের মধ্যে বড় মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। ছোট ছেলের বয়স ৫ বছর।

শিমুর ভাই শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, গত রবিবার সকালে তাদের ১৭ বছরের মেয়ে ও পাঁচ বছরের ছেলে বাসাতেই ছিলেন। তবে তারা কেউ ঘটনা সম্পর্কে কোনো কিছু টের পায়নি। ওটা নোবেলদের নিজেদের বাড়ি। নিজেদের থাকার ফ্ল্যাটটা তারা বড় করেই বানিয়েছিলো। এই কারণে ছেলে-মেয়েদের ঘরগুলোও দূরে দূরে। ফলে তারা কিছু শুনতে পায়নি।

নোবেল ছেলে-মেয়েদের বলেছিলো তাঁর মা সকালে শ্যুটিংয়ে বেড়িয়েছে। ছেলেমেয়েরা সেই কথাই সবাইকে বলে জানান খোকন। 

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুকে হত্যা করে নিখোঁজের নাটক সাজাতে চেয়েছিলো তাঁর স্বামী নোবেল। হত্যার পর রাতভর মৃতদেহ পাহারাও দেন তিনি। পরিকল্পনা ছিলো মৃতদেহ গুম করা বা অজ্ঞাত হিসেবে ফেলে দেওয়া। পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে তা সম্ভব হয়নি।
 
কেরানীগঞ্জ থেকে শিমু’র দ্বিখণ্ডিত মৃতদেহ উদ্ধারের পর পরই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে নামে পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেলই শিমুকে হত্যা করেন। শনিবার মধ্যরাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। শিমু ও তাঁর স্বামী অনেকটাই বেকার ছিলেন। সাংসারিক টানাপোড়েনে ঝগড়া লেগে থাকতো প্রায়ই। তাঁদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হয় শনিবার মধ্যরাতে। এক পর্যায়ে শিমু’র গলা টিপে ধরেন নোবেল। নিস্তেজ হয়ে পড়েন শিমু। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে সারারাত মৃতদেহ পাহারা শেষে সকালে বাল্যবন্ধু ফরহাদকে ডেকে এনে গুমের পরিকল্পনা করেন নোবেল। এরপর নোবেল তাঁর বন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদ-এর সহায়তায় মৃতদেহ দুই খণ্ড করে বস্তায় ভরে কেরানীগঞ্জে নিয়ে ফেলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিমু’র মৃতদেহ যে বস্তায় রাখা হয়েছিলো, সেই বস্তা সেলাই করা সুতার মাধ্যমে সন্দেহের আওতায় আসেন তাঁর স্বামী নোবেল। একই রকমের সুতা নোবেলের, বাসায় পাওয়া যায়। এছাড়া গাড়িটি ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর আলামতও মেলে। এরপর মেলে যোগসূত্র।

জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে নোবেল স্বীকার করেন, তিনি শিমুকে গলা টিপে হত্যা করেন। এরপর বন্ধু ফরহাদকে মোবাইল ফোনে কল করে ডেকে নেন। পরে ফরহাদ ও নোবেল পরিকল্পনা করে বাইরে থেকে বস্তা এনে শিমু’র মৃতদেহ লম্বালম্বিভাবে দু’টি পাটের বস্তায় ভরে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করেন। এরপর চালাকি করে বাড়ির দারোয়ানকে নাশতা আনতে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া এই দৃশ্য যেন সিসি ক্যামেরায় ধরা না পড়ে তাই বন্ধ করে দেওয়া হয় মেইন সুইচ। এরপর নিজের ব্যক্তিগত গাড়ির পেছনের আসনে শিমু’র মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে যান।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, ভীড়ের কারণে মৃতদেহ ফেলতে না পারায় মিরপুরের রূপনগর ও বেরিবাঁধে ঘোরাঘুরি করে রবিবার সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসেন। পরে রাত দশটার দিকে আবার বের হয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা ব্রিজ হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়নের ওই এলাকায় সড়কের পাশে ঝোপের ভেতর মৃতদেহ ফেলে আসেন তারা। পরে রাত ১২ টার দিকে কলাবাগান থানায় জিডি করতে যান নোবেল।  জিডিতে বলেন, রবিবার সকালে কাউকে কিছু না বলে কলাবাগানের বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন শিমু। কিন্তু মৃতদেহ উদ্ধারের পর শিমু’র বাসা থেকে এক গোছা সুতা উদ্ধার করে পুলিশ। যে সুতা দিয়ে মৃতদেহের বস্তা সেলােই করা হয়েছে। 

জানা গেছে শিমু’র গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার সদর থানার সিআইপাড়া এলাকায়। তাঁর বাবার নাম নূর ইসলাম। শিমু ১৮ বছর আগে ফরিদপুরের কমলপুর গ্রামের নোবেলকে প্রেম করে বিয়ে করেন। তাঁদের ১৬ বছরের একটি মেয়ে ও সাত বছরের একটি ছেলে আছে।

১৯৯৮-এ কাজী হায়াতের ‘বর্তমান’ সিনেমায় দ্বিতীয় নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন শিমু। এরপর ২০০৪ পর্যন্ত ২৫টি সিনেমায় তিনি দ্বিতীয় নায়িকা ছিলেন। শিল্পী সমিতি থেকে ভোটাধিকার হারানো ১৮৪ জন শিল্পীর মধ্যে ছিলেন তিনি। ভোটাধিকার রক্ষার বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে।

বিভি/রিসি 

মন্তব্য করুন: