• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

দাম না বাড়িয়েও বিপিসির মুনাফার টাকা দিয়ে চলতো ২১ মাস: বিশেষমত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:৩৩, ৮ আগস্ট ২০২২

আপডেট: ২১:৩৪, ৮ আগস্ট ২০২২

ফন্ট সাইজ
দাম না বাড়িয়েও বিপিসির মুনাফার টাকা দিয়ে চলতো ২১ মাস: বিশেষমত

দেশে জ্বালানি তেলের দাম এখন না বাড়ালেও চলতো বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের হিসাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত ৮ বছরে লাভ করেছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা লোকসান দেওয়ায় দেশে জ্বালানির দাম ৪৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অথচ সব খরচ বাদ দিয়ে বিপিসির ব্যাংকে ৩২ হজার কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে। এই হারে লোকসান করেও মুনাফার টাকায় প্রায় ২১ মাস এবং ফিক্সড ডিপোজিটের টাকায় ১৯ মাস জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে পারতো বিপিসি। 
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা আট বছর ৪৮ হাজার কোটি টাকা লাভ করার পর ৬ মাসে ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান দেওয়ায় একলাফে ৪৭ শতাংশ দাম বাড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। যখন বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে তখনও তো দাম কমানো হয়নি। মুনাফার টাকা দিয়ে ভর্তুকি দেওয়া যেত। বিশ্ববাজারের জ্বালানির দাম ক্রমাগত কমছে। দাম না বাড়িয়ে আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা যেত। তা হলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। ব্যাংকে বিপিসি ও এর তিন বিতরণ কোম্পানির যে ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে তা দিয়েও ভর্তুকি দেওয়া যেত। সরকার বিপিসির কাছ থেকে লভ্যাংশ ও ভ্যাট-ট্যাক্স না নিলেও দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না। বিপিসি লোকসানের কথা বললেও তাদের হাজার কোটি টাকার একাধিক মেগা প্রজেক্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ৯ জুন প্রকাশিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রকাশনা ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা’র তথ্য অনুযায়ী, বিপিসি ১৫ সালে ৪ হাজার ১২৬ কোটি, ১৬ সালে ৯ হাজার ৪০ কোটি, ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৬৫৩ কোটি, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৬৪৪ কোটি, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি, ২০২০ সালে ৫ হাজার ৬৭ কোটি, ২০২১ সালে ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ও ২০২২ সালের ২৩ মে পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।

বিপিসির বাজেট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৯ হাজার ৯৩২ কোটি, ২০১৯ সালে ৮ হাজার ৬৬৮ কোটি, ২০২০ সালে ১৪ হাজার ১২৩ কোটি, ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৪৬ কোটি ও ২০২২ সালে ৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স ও লভ্যাংশ বাবদ দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপিসির লভ্যাংশ থেকে গত ৭ বছরে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া এক লিটার ডিজেল থেকেই সরকার ২০১৯ থেকে ২০২০ টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে আদায় করে। বছরে জ্বালানি তেল থেকে সরকার ৮-৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে গত ৭ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বিপিসি। বিপিসির তথ্যানুসারে, ২০১৮ অর্থবছর থেকে সংস্থাটি শুল্ক, কর ও লভ্যাংশ বাবদ সরকারি কোষাগারে ৫৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিপিসির তিনটি বিতরণকারী কোম্পানি- পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যাংক আমানত রয়েছে। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না বিপিসির ৩২ হাজার কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন।

দাম না বাড়িয়ে এই হারে লোকসান করতে থাকলে মুনাফার টাকায় প্রায় ২১ মাস এবং ফিক্সড ডিপোজিটের টাকায় ১৯ মাস জ্বালানি সরবরাহ করতে পারত বিপিসি। এ ছাড়া ২০২০ এবং ২০২১ অর্থবছরে সরকারের কোষাগারে ৯ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে করপোরেশনটি, যা দিয়ে দাম না বাড়িয়েও আরও চার মাস লোকসান সমন্বয় করা যেত। 

গত দুই অর্থবছর সরকার জ্বালানি তেল থেকে যে পরিমাণ শুল্ককর আদায় করেছে, তা দিয়ে দাম না বাড়িয়ে আরও অন্তত ১০ মাস জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যেত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোকসানের কথা বললেও প্রায় ১১ হাজার ৫১ কোটি টাকার ১১টি উন্নয়নমূলক প্রকল্প চলছে বিপিসির। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৩১৭ কোটি টাকায় তিনটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মিত হচ্ছে। ঢাকার শাহবাগে ৩৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা অয়েলের জন্য একটি ১২ তলা ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন।

গত ৮ বছরে (২০১৪-২০১৫ থেকে ২০২১-২০২২) বিপিসি ৪৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে সেই টাকা থেকেই ভর্তুকি দেওয়া যায় উল্লেখ করলে বিপিসি চেয়ারম্যান সম্প্রতি বলেন, এই ৪৮ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল, কার কাছে গেল, কার পকেটে কত টাকা গেল, এটা তো বোঝাতে হবে। গত ৩ বছরে আমরা সরকারকে ১১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। প্রতিবছর ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আমাদের আয় যেমন হয়েছে, তেমন ব্যয়ও তো হয়েছে। আমাদের মেগা প্রজেক্ট চলছে তিনটা। সেই প্রজেক্টের টাকা কোথা থেকে আসছে? 

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন এবিষয়ে বলেন, বিপিসি এখন সরকারের রাজস্ব আয়ের খাত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই এমনটা আছে। ভারতেও আছে। কিন্তু তাদের বিষয়টি স্পষ্ট। ভারত রাজস্ব নিলেও মার্কেট স্থিতিশীল রাখতে রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, বিপিসির যে ফিক্সড ডিপোজিট আছে, যতদূর জানি সেটার লাভ থেকে তারা লভ্যাংশ পায়। সে জন্য তারা সেটা ভাঙতে চায় না। এখনই জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে লাভের টাকা দিয়ে ভর্তুকি দেওয়া যেত।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিপিসি লস দিচ্ছে সেটা বললে হবে না, প্রমাণ করতে হবে। বিপিসি যে টাকা মুনাফা করেছে এবং সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ অর্থ না নিলেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর দরকার হয় না। পেট্রোল এবং অকটেনে বিপিসির মুনাফা হবে। এটা প্রতারণার শামিল। বিপিসি লোকসানের কথা বললেও মুনাফার টাকায় তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিভি/এইচএস

মন্তব্য করুন: