• বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২ | ৭ মাঘ ১৪২৮

BVNEWS24 || বিভিনিউজ২৪

বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীতে মিললো অসহনীয় মাত্রায় অ্যামোনিয়া ও ফেনল

প্রকাশিত: ২২:১০, ১১ জানুয়ারি ২০২২

আপডেট: ২২:১১, ১১ জানুয়ারি ২০২২

ফন্ট সাইজ
বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীতে মিললো অসহনীয় মাত্রায় অ্যামোনিয়া ও ফেনল

সংগৃহীত ছবি

হেমায়েতপুর ট্যানারি সংলগ্ন এলাকাসমূহে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদার্থের অতিরিক্ত উপস্থিতি মিলেছে। এখানে অতি উচ্চমাত্রার অক্সিজেনের চাহিদা, আদ্রতা, এমোনিয়া ও ফেনলের উপস্থিতি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকারক।

মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর বছিলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম এর আয়োজনে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য দ্বারা নদী দূষণ বন্ধে “ট্যানারি শিল্প ও নদী দূষণ” শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। এর আগে বছরজুড়ে এই দুই নদীর পানিতে ট্যানারির ক্ষতিকর দিক নিয়ে গবেষণা করে এই কনসোর্টিয়াম।

রাজধানী ঢাকাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে একটি বাসযোগ্য নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে ইউএসএআইডি, এফসিডিও এবং কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমÐলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) কে সংগে নিয়ে ওয়াটারকিপার্স কনসোর্টিয়ামের দূষণবিরোধী নাগরিক প্রচেষ্টা প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়। 

সংলাপ অনুষ্ঠানে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর পানির মান নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপনা করেন কনসোর্টিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম।  

তিনি বলেন, সিসিএমই সূচকে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে হেমায়েতপুরের অবস্থান সবার নিচে যা পানির গুনমানকে সর্বদাই হুমকির মুখে রাখে। যেহেতু হেমায়েতপুর উজানে অবস্থিত এবং ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার উপনদী, সেহেতু হেমায়েতপুরের পানিই পরবর্তীতে ঢাকায় প্রবেশ করে। 

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ইলিয়াসুর রহমান বাবুল এবং ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম নেতা এবিএম মাসুদ। 

সংলাপে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লইমেট চেঞ্জ এক্সপার্ট মনির হোসেন চৌধুরী, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি  ফাতেমা-তুজ-জোহরা, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ, বছিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সোলায়মান, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. রাকিবুল ইসলাম, বারসিকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফেরদৌস আহমেদ, সিইউপি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মাহবুল হক, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির রুমানা আফরোজ দীপ্তি, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. কামরুজ্জামান এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের পরিবেশ সাংবাদিক ও স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। 

সংলাপে ওয়াটারকিপার্স এর সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর নিয়ে গেলাম তাতে কি আমরা দূষণের মাত্রা কমালাম নাকি আরো ছড়িয়ে দিলাম? আমরা ট্যানারি শিল্পকে ধ্বংস হতে দিতে চাই না। আমরা চাই দূষণ বন্ধ করে পরিবেশসম্মতভাবে এই শিল্পের কলেবর আরো বৃদ্ধি হোক। ট্যানারি শিল্পের দূষণের সমস্যার সমাধান আমাদের সবাই মিলে করতে হবে আর এর জন্য সরকারকে রোডম্যাপ করতে হবে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ইলিয়াসুর রহমান বাবুল বলেন, আমরা ট্যানারি মালিক, আমরা পরিবেশবান্ধব ট্যানারি তৈরি করতে চাই। কিন্তু আমাদের কারোরই কোন পরিকল্পনা নাই। শিল্প মন্ত্রণালয় কোন বিষয়ের দায়ভার নিতে চায় না। শুধু মামলা খাই আমরা ট্যানারি মালিকেরা। আরো অন্ততঃ ৪০০ একর জায়গা পেলে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি করতে পারবো। 

ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবিএম মাসুদ, ট্যানারি শিল্প মানে শুধু ট্যানারি মালিক নয়, ট্যানারি শিল্প মানে গ্রামের একজন কৃষকও যে পশুপালন করে বিক্রয়ের জন্য। 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার প্রতিনিধি রুমানা আফরোজ বলেন, আমরা উন্নয়ন করতে চাই কিন্তু উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা নদী হারাতে চাই না। উন্নয়ন তো করাই যাবে, কিন্তু নদী মরে গেলে আমরা আর নদীকে ফিরিয়ে আনতে পারবো না। 

পরিবেশ অধিদফতর ফাতেমাতুজ্জোহরা বলেন, আমরা নতুন করে আর কোন ট্যানারির অনুমোদন দিচ্ছি না। তবে দেশটা আমাদের সবার। সবাই মিলে যদি দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তবে দেশটাকে সুন্দর করা সম্ভব। 

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আগে একটা গরুর চামড়া দেড়হাজার অথবা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রয় হতো কিন্তু এখন ২০০ টাকাও না। ফলে গবাদীপশু পালনকারীরা আর লাভবান নয়। আমরা দেখেছি চোরাই লাইন দিয়ে নদীর মাঝখানে দূষিত বর্জ্য ফেলা হয় আর কর্তৃপক্ষের লোক গেলে চোরাই লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

গণমাধ্যমকর্মী সাদিয়া চৌধুরী বলেন, হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থাপনের আগে সেখানে ধলেশ্বরী নদীর পানির অবস্থা খুবই ভালো ছিল। আমরা সেখানে গিয়ে সেখানকার মাছ খেতাম। কিন্তু এখন সেখানকার অবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষেরা দূষণের প্রভাবে সমস্যাগ্রস্ত। সেখানকার মাছ আর খাওয়া যায় না। বর্জ্য যথাযথ পরিশোধন হয়ে নদীতে পড়ছে না। 

গণমাধ্যমকর্মী মোস্তফা ইউসুফ বলেন, ইটিপিগুলোকে কিভাবে মনিটরিং এর আওতায় আনা যায় তা পরিবেশ অধিদফতর চিন্তা করতে পারে। 

গণমাধ্যমকর্মী কেফায়েত শাকিল বলেন, পরিকল্পনাকারীর পরিকল্পনায় ভুল করেছেন। বিশেষ করে যারা পরিবেশগত সমীক্ষা করেন তারা। তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 

গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল মাসুম বলেন, আমাদের পরিকল্পনাগুলো হুটহাট যা পাঁচ বছরেই অকার্যকর হয়ে যায়। আমাদের পরিকল্পনা করতে হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী। 

সিইউপি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মাহবুল হক বলেন, আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই, আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। কিন্তু সে উন্নয়ন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে উন্নয়ন করতে হবে পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনা রেখে উন্নয়ন করতে হবে। নদী দূষণের দায় পরিবেশ অধিদফতর কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। 

বারসিক-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফেরদৌস আহমেদ বলেন, সরকারের যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন তাকে যদি আমরা মেনে চলি তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। পরিবেশ-প্রাণ-বৈচিত্র্যকে যদি আমরা সবার উপরে স্থান দিই তবে।

দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো: রাকিবুল ইসলাম বলেন, যারা ট্যানারিতে কাজ করে তাদের স্বাস্থ্যগত বিষয় নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। 

বারোগ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, আমজাদ হোসনে বলেন, ব্যবসা আপনাদের, লাভ আপনাদের, তবে আমরা কেন তার ভার বহন করবো। আপনাদের বর্জ্য কেন আমাদের বুকের উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। আমাদের কি অপরাধ?

সাবেক ইউপি সদস্য জান্নাতি আক্তার রুমা, আমাদের পরিবেশ আগে যেমন ছিল আমরা তেমন নদী আর পরিবেশ চাই। 

সবশেষে ধন্যবাদ প্রদান করেন কনসোর্টিয়াম সদস্য, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং বায়ুমÐলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)’র পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। 

সংলাপ অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এএসএম আলী কবীর এর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

বিভি/কেএস/এসডি

মন্তব্য করুন: