• NEWS PORTAL

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফের চাঙা শেয়ারবাজার: ফের কেলেঙ্কারি না হোক

মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার

প্রকাশিত: ১৫:১৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪

ফন্ট সাইজ
ফের চাঙা শেয়ারবাজার: ফের কেলেঙ্কারি না হোক

পুঁজিবাজার বা শেয়ারবাজার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কম। কারো কারো একদম নেই। এই বাজারের সুখবর-কুখবরের ঘটনাও প্রথমে জানেন কেবল সংশ্লিষ্টরা। পরে জানে অন্যরা। কয়েক দফায় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির খবর সবারই জানা। সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, ব্যবস্থাপক ও অদৃশ্য সংস্থা অনৈতিক হস্তক্ষেপ না করলে শেয়ারবাজার চাঙা হওয়ার বাস্তবতা দেশে এখনও আছে। অন্তত গত কয়েকদিনের নমুনা তাই বলছে। মঙ্গলবার ফ্লোর প্রাইস ও প্রফিট টেকিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সব সূচক ও লেনদেন বেড়েছে। নানা মন্দ খবরের ছড়াছড়ির মধ্যে এটি অবশ্যই এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ও আশা জাগানিয়া সংবাদ।

অর্থখাতসহ দেশের অন্যসব মৌল সূচক ঋণাত্মক হলেও পুঁজিবাজারের সবগুলো সূচকেরই ধনাত্মক পরিবর্তন ঘটেছে। যদিও মৌল তত্ত্ব অনুযায়ী, এ ধরনের চিত্র পুঁজিবাজারের টেকসই ধনাত্মক পরিবর্তন সমর্থন করে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থাপনা মৌল সূত্র অনুসরণ করছে না। সে ক্ষত্রে, উল্লিখিত মৌল অবস্থানের বাইরে গিয়েও পুঁজিবাজারের ধনাত্মক অবস্থান টেনে নেয়া সম্ভব। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশের বিরাজমান ডলার ও টাকার তারল্য খরা দূর করাও সম্ভব। সেইক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের দরজা প্রশস্ত করে জানালাগুলো খুলে দিতে হবে। সরকার আন্তরিকতা অবশ্যই এখানে বড় শর্ত। 

শেয়ার বাজার না বুঝলেও, কে না জানে মুনাফা যেখানে পুঁজির আকর্ষণও সেখানেই। দেশেই এখন এক ডলারে দুটি বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার পাওয়া যায়। বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে চুটিয়ে ব্যবসা করে। আকর্ষণীয় লভ্যাংশও বিতরণ করে। ডিএসই’র ওয়েটেড আ্যভারেজও ১৩.২৯। এ অনুপাত ক্রয় ও বিনিয়োগানুকুল অবস্থান নির্দেশ করে। মুনাফা স্থলে পুঁজির সমাবেশ ঘটবেই। কাঁটা তার বা চীনের প্রাচীর তুলেও পুঁজির প্রবেশ ঠেকানো যাবে না। পুঁজিবাজারের ধনাত্মক অবস্থান ধরে রেখে ষাঁড়ের আগমন সড়ক প্রশস্ত করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ আন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকেও (ডিএসই) ঢেলে সাজানো জরুরি। বিএসইসি ও ডিএসই উভয় প্রতিষ্ঠানেই ব্যর্থ ও দুর্নীতিবান্ধব জনবলের সমাবেশ ঘটেছে। এ কারণে পুঁজিবাজারে গত আড়াই দশক জুড়ে মন্দা লেগেই আছে। পুঁজিক্ষরণও অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতেও পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান থেকে দাবি করা হচ্ছে, পুঁজির নিরাপত্তা সংরক্ষণে তারা জীবনপাত করছে। বিএসইসি প্রবর্তিত ফ্লোর প্রাইস ছোট, বড় ও মাঝারি সব বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ ক্ষয় করেছে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ দেড় বছর যাবৎ আটকে রয়েছে। 

গত সপ্তাহের শেষদিন বৃহস্পতিবার ৩৫টি ইন্সট্রুমেন্ট বাদে বাকী ইন্সট্রুমেন্টগুলো 'বিএসইসির আইসিইউ কেবিন' থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন আংশিক ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর আগামী দিনগুলোতে বাজার চিত্র খোর অপেক্ষা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সুরক্ষায় বিএসইসি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? এটাও দেখার বিষয়। সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবার থেকে এর 'টেস্ট কেস' শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভালো টেস্টেই এগোচ্ছে। বিএসইসি প্রতিটি বিনিয়োগকারীর, বিনিয়োগ আ্যকাউন্টে ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় যতবার খুশি ঢুকার অধিকার নিতে উদ্যোগী হয়েছে। 

শেষ ভালো যার সব ভালো তার বলতে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। এর আগে শেষটা ভালো হয়নি। যতবার শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছে, কিছুদিন পর ততবারই সর্বনাশা খবর এসেছে। এবারও শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচার হয়নি। তখন মুখ ফসকেই উচ্চারণ হয়ছে, তাহলে এই ফটকা বাজার কেন আছে? না থাকলেই বা কী ক্ষতি হয়? বরং উপকারই হয়। দেশে এমন অনেক কিছুই আছে বা হচ্ছে যা না থাকলে দেশের কোনো ক্ষতিই হতো না। দেশের শেয়ারবাজারের সেই কথা বলতে গেলে সাতকাহন হয়ে যাবে। অথচ বিশ্বব্যাপী শিল্পের পুঁজির জোগান দেয় এই বাজার আর এখানকার বিনিয়োগকারীরা। আমাদের ব্যাংকগুলোর সবই প্রায় বাণিজ্যিক ব্যাংক। তারা স্বল্প মেয়াদে আমানত নেয়। আর বড় বড় রাঘববোয়ালদের সেখান থেকে ঋণ দেয়। বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে এই অর্থ খেলাপি হয়ে যায়। ব্যাংকগুলো এইসব ঋণ গ্রহিতাদের হাতে-পায়ে ধরেও ফল পায় না। খুব কমই ফেরত পাওয়া যায়। পেলেও সুদের পুরোটা মওকুফ করে দিতে হয়। 

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে শেয়ারবাজারকেই অর্থনীতির প্রধান প্যারামিটার ধরা হয়। শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর তারা সবার আগে হাত দেয় শেয়ারবাজারের দিকে। এতে তারা সফলতা পায়। তাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দাঁড়ানো হয় না। শেয়ারবাজার যারা ধ্বংস করেছে, তারাই ব্যাংক ফোকলা করছে। তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। সেই কেলেঙ্কারির হোতাদের কেউ কেউ পরে মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। বর্তমানেও আছেন ফোকলাকাণ্ডের কয়েকজন। তাই শেয়ারবাজার আবার তেজি হওয়ায় পুরনো ভয়-আতঙ্ক নতুন করে ভর করেছে কারো কারো মধ্যে। 

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধ বাড়ায়। শেয়ারবাজার নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেশি আলোচনা দরকার। প্রতিবেশী ভারতে সূচক যখন ৬০ হাজারের ঘরে চলছে তখন আমরা ৬০০ এর ঘরে আটকে আছি। শেয়ারবাজারের মূল পুঁজি জনসাধারণের। কিন্তু তারা শক্তিমান নয়। এই দেশে কোনো শক্তিমান লোকের বিচার হয় না। এটাই দেশের স্বাধীনতার সুফল। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে। কেউ আইনের ডান্ডাবেড়ি নিয়ে মৃত্যু বরণ করবে। মৃত্যুর পরও লাশের পায়ে ডান্ডাবেড়ি থাকছে। শেয়ার অরাজকতার মাঝে মতিঝিলের অফিস থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার কারবারও হয়েছে। ভয়-বেদনা এবং শেয়ারবাজার নিয়ে এতো কথা এ কারণেই। 

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাপোস্ট

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন: