• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ | ১৬ আষাঢ় ১৪২৯

মারিওপুল দখল করতে পারেনি পুতিন, ধ্বংস করতে পেরেছে

তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস

প্রকাশিত: ১৫:০৫, ২৬ এপ্রিল ২০২২

আপডেট: ১৫:১৯, ২৬ এপ্রিল ২০২২

ফন্ট সাইজ
মারিওপুল দখল করতে পারেনি পুতিন, ধ্বংস করতে পেরেছে

১৭ই জুলাই ২০১৪তে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স এর একটি যাত্রাবাহী বিমান আকাশের ৪২ হাজার ফুট উপরে ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হলো। বোয়িং 777-200ER ফ্লাইটি MH17 আমস্ট্রর্ডাম থেকে ২৮৩ জন যাত্রী এবং ১৫ জন ক্রু নিয়ে ফিরছিলো কুয়ালা লামপুরে। 
একটি সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা! তাও মালয়েশিয়ার একটি বিমানে? মালয়েশিয়া তো কারো সংগে লাগতেও যায় না, অন্যের সাত-৫-এও থাকে না। তাহলে ঘটনা কি?
বিমানটি উড়ে যাচ্ছিলো ৪২ হাজার ফুট উপর দিয়ে। কোন সাধারণ ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে অত উপরের একটি বিমানকে ধ্বংস করা সম্ভব না। এবং বিমানটি উড়ছিলো ইউক্রেন এর আকাশের উপর দিয়ে। 

ইউক্রেনের সংগে মালয়েশিয়ার সম্পর্ক ‘শত্রুতাপূর্ণ’ নয়। 
সুতরাং ইউক্রেন কেন মালয়েশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালাবে?
বিষয়টি নিয়ে জল অনেক ঘোলা হল।
ইউক্রেন দাবী করলো তাদের হাতে এমন কোন ক্ষেপনাস্ত্রই নেই যা দিয়ে ৪২ হাজার ফুট উপরে একটি বিমানে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করা সম্ভব! 
নড়েচরে বসলো বিশ্ববাসী, নিরাপত্তা এবং এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা। 
তারপর যে তথ্যটি সামনে চলে আসলো সেটা ছিলো ভয়াবহ। 
আমেরিকা জানালো যে, বিমানটিকে ধ্বংস করা হয়েছে একটি রাশিয়ায় নির্মিত ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে। ইউক্রেনের আকাশে রাশিয়ান ক্ষেপনাস্ত্র? কিভাবে সম্ভব? 

২০১৪ সালে রুশ ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে মালয়েশিয়ান বিমানটিকে ধ্বংস করে হত্যা করেছিল প্রায় ৩০০ নিরীহ মানুষকে

এবার আসুন প্রকৃত ঘটনায়। 
ইউক্রেনের পুর্বাঞ্চলকে সংক্ষেপে বলা হয় ডনবাস। রাশিয়ান একনায়ক ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে গত ২ মাস আগে আগ্রাসন চালানোর আগের দিন পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাসের দু’টো ইউক্রেনিয় ভূমিকে ‘স্বাধীন’ বলে ঘোষনা দিয়েছিলো। সেই ডনবাস অঞ্চলের সবচে বড় শহর হচ্ছে মারিওপোল। পুতিনের বক্তব্য ছিলো সে ডনবাস অঞ্চিলীয় এলাকাদুটোকে ইউক্রেনের ভেতর থেকে বের করে এনে দু’টি স্বাধীন দেশে পরিণত করবে। 
পুতিনের সেই ঘোষনা ২ মাস আগের হলেও ঐ অঞ্চলকে স্বাধীন করার চেস্টা বিগত ২ দশকেরও বেশী সময় ধরে চালিয়ে যাচ্ছে সে। শুধুমাত্র ডনবাসকেই নয়, ক্রাইমিয়া দখল করাও ছিলো পুতিনের দীর্ঘমেয়াদী সেই অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেরই অংশমাত্র। 
আদতে ডনবাসকে ইউক্রেন থেকে আলাদা করতে ইউক্রেনের রুশভাষী সংখ্যাধিক্ষ্য কিছু লোক বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে আসছিলো বহুবছর থেকেই। সেই বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই আকাশ দিয়ে উড়ে যাবার সময় রুশ ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে মালয়েশিয়ান বিমানটিকে ধ্বংস করে হত্যা করেছিল প্রায় ৩০০ নিরীহ মানুষকে। আর পুরো পরিকল্পনাই ছিলো রুশ একনায়ক পুতিনের। বিশ্ববাসীকে দেখানো যে- এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতা চায়। 
আর ইউক্রেন সরকার বরাবরই নিজ স্বাধীন দেশের অখন্ডতা রক্ষার জন্য পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরস্ত্র করার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলো। 

যাই হোক, প্রেসিডেন্ট পুতিন ২ দিনের মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী ক্রিয়ভ দখলের লক্ষ্যে তার বিশেষ সামরিক আগ্রাসন শুরু করেছিলো গত ২ মাস আগে। ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্যাংক বহর নিয়ে রওয়ানাও দিয়েছিলো তার সেনাবাহিনী মাত্র ২ দিনে কিয়েভ দখলে নিবে বলে। 
কিন্তু বিশ্বের তথাকথিত ’সুপারপাওয়ার’ - সেই ট্যাংক বহর থেকে প্রায় ৭০০ ট্যাংক এবং ২০ হাজার সেনা হারিয়ে চরম মার খেয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলো ইউক্রেন থেকে। ৭ জন জেনারেলসহ এই দুই মাসে ১৩ জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছে ইউক্রেনিয় সেনাদের সংগে সম্মুখযুদ্ধে। 
’সুপারপাওয়ার’ এর ইজ্জত পাংচার হয়ে যাওয়ায় কি করবে ভেবেও কুল করতে না পেরে বিশেষ অভিযানের ‘প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে’ ঘোষনা দিয়ে দখলে নেবার চেষ্টা শুরু করেছিলো ম্যারিওপুল শহরটিকে যেটি ইউক্রেনের সেই পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং যেটা দখল করার জন্য ২০ বছর যাবৎ পুতিনের অনুগত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে শহর থেকেই মালয়েশিয়ান বিমানে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী পুতিন-সমর্থকরা।

যাই হোক, মারিওপুলকে দখল করতে গিয়ে এবার মাটির সংগে মিশিয়ে দিয়েছে রুশ বাহিনী। হসপিটাল, স্কুল, মসজিদ, গীর্জা কিছুই বাকী রাখেনি ধ্বংস করা থেকে। আর সংগে চেচনিয়ার ‘তথাকথিত মুসলিম’ রুশ দালাল ’রমজান’ বাহিনীও চালিয়েছে নারকীয় হত্যাকান্ড। ধর্ষন করেছে অসংখ্য নারী-শিশুকে। 
মারিওপুল দখল করতে পারেনি পুতিন - তবে ধ্বংস করতে পেরেছে। এতো কিছুর পরও মারিওপুলের লোকজন এবং সেনারা এখনও অবধি আত্মসমর্পন করেনি। ধ্বংসস্তুপের মধ্যে একটি বড় স্টিলমিলের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে রেখেছে তারা। তাদের আত্মসমর্পন করাতে বার্থ হয়েছে রুশ সেনারা। 
পুতিন নিজের ইজ্জত বাঁচাতে এখন শুধুমাত্র ডনবাস অঞ্চলকে (যেখানে রুশভাষী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিগত ২ দশক ধরে বিচ্ছিন্ন হবার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে) যেভাবেই হোক (প্রয়োজনে ধ্বংশ করে) তার মুল ভূখন্ডের সংগে যুক্ত করবেই। 
ইউক্রেনকে দখল করতে ব্যর্থ হয়ে এই সান্তনাটুকু যদি এই ‘সুপারপাওয়ার’ না পায় - তাহলে কিভাবে চলবে?
কিন্তু তারপরও ইউক্রেন বিনাযুদ্ধে ডনবাস রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে নারাজ। ইউক্রেন এখন বিশ্বাস করে রাশিয়ান বাহিনী আসলে অন্তসারশূণ্য একটি বাহিনী মাত্র, যাদের পরাস্থ করা খুবই সাধারণ বিষয়। 
বিগত ২ মাসে এতটুকু অভিজ্ঞতা হওয়া যে-কারো জন্যই সাধারণ বিষয়।
আর আমেরিকান দানে পাওয়া কিছু সামান্য যুদ্ধাস্র দিয়েই যে ‘মহাশক্তি’ বা ‘সুপারপাওয়ার’কে এভাবে সামান্য ইউক্রেন নাকে খত দিয়ে দিলো - আমেরিকার সংগে যদি কোনও দিন সম্মুখ যুদ্ধ হয় তাহলে যে রাশিয়ার কি হাল হবে - সেটা ভেবেই আমার হাসি পাচ্ছে!
সারা বিশ্বের সব স্বৈরশাসকদের আদর্শপিতা ও রক্ষাকারী একনায়ক পুতিনের চুড়ান্ত পরিণতি দেখার অপেক্ষায় বিশ্বের আট বিলিয়ন মানুষ এবং আমিও।

 

বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশনের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নেবে না।

মন্তব্য করুন: