• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ | ১৬ আষাঢ় ১৪২৯

আমরা কতটুকু সচেতন আমাদের আশেপাশের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে

আশিকুর রহমান সমী

প্রকাশিত: ২১:২৬, ২২ মে ২০২২

ফন্ট সাইজ
আমরা কতটুকু সচেতন আমাদের আশেপাশের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে

আজ থেকে ২০ বছর আগে আমরা যদি আমাদের নিজেদের এলাকার কথা চিন্তা করি, মনে পড়বে সবুজ এক গ্রামের কথা, যেখানে সকালবেলা সূর্য সোনারোদ ছড়ানোর সাথে সাথে পাখিরা শুরু করতো মধুর সুরে কলকাকলি আর তাদের গান শুনেই ঘুম ভাঙতো সবার। বাড়ির পাশে ছিলো সবুজ আচ্ছাদন। ছিলো দখিনা বাতাস। 

শহরগুলোও কিন্তু ঠিক তখন এতটা ঘিঞ্জিময় ছিলোনা, শহরের জলাশয়গুলোও ছিলো না এতটা দূষিত। তখনও বড় বড় গাছ, বুনো গাছ ছিলো শহরে। সবুজ তখনও ছিলো। কিন্তু ক্রমেই বড় হচ্ছে শহর, কংক্রিট কেড়ে নিচ্ছে শহর। গ্রামেও একসময় যে সকল বুনো গাছপালা দেখা যেত তা এখন আর দেখা যায় কি? মানুষ কি তার দরকারি, প্রতক্ষ্যভাবে অর্থনৈতিক উপকারী উদ্ভিদ ছাড়া কোন গাছ আরও লাগায়! আর গ্রামও ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার প্রকৃত রূপ, তার চিরসবুজ বৈশিষ্ট্য। 

হারিয়ে যাচ্ছে জীব বৈচিত্র্য

বর্তমান সময়ে ক্রমেই কমে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের জীব বৈচিত্র্য। আমরা হয়তো আইকনিক বা বড় জীবদেরই খেয়াল করছি, যেমন বাঘ, হাতি ইত্যাদি। হ্যাঁ এটা অবশ্যই ভালো। কারণ এরা একটি ইকোসিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের কি একবারও ভেবে দেখা উচিত নয়, আমাদের আশেপাশের ছোট ছোট প্রাণীদের কি অবস্থা। ফড়িং বা প্রজাপতিরা কেমন আছে। বাড়ির পাশের গাছে পাখিরা কেমন আছে? হয়তো আমাদের সেই সময়টা নেই। 

মনে করুন তো, আজ থেকে ১০/১৫ বছর আগে যেমন প্রজাপতি বা ফড়িং দেখতেন, এখন কি ঠিক ঐ রকম আছে? আমার নিজের দেখা, গত ৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বিভিন্ন জলাশয় এমনকি ঢাকার বাইরেও এদের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। কিন্তু এরাও আমাদের জীব বৈচিত্র্যের অংশ, ছোট হলেও এর পরিবেশের নির্দেশক প্রাণী।

চলুন ফিরে যাই গ্রামে। আজ গ্রামের সেই ঘন বাগানগুলো আর চোখে পড়ে না, যা ছিলো বিভিন্ন জীবের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখনও মনে আছে, আমার বয়স তখন ৪-৫। আমাদের জানালা বরাবর দূরে একটি বড় গাছ ছিলো, গাছের মগডালে ছিলো বড় এক পেচাঁর বসবাস।

বাড়ির পাশের বাগানে ছিলো নিম পেঁচারা। ভয়ে। দেখতে যেতাম নিয়োমিত। বড়রা বলতো পেঁচার চোখের দিকে বেশিক্ষণ না তাকাতে। পেঁচা চোখ উপরে নিয়ে যাবে। কালের পরিক্রমায় ঐ বাগান নেই, গাছ নেই, আর গাছে পেঁচাও নেই। ছোটবেলার বুনো ফল গুলোর কথা মনে আছে? গাব, বুনো আমরা, ডেউয়া, লটকন, ডুমুরসহ বিভিন্ন জিনিস। 

গ্রামে এখন এই গাছ গুলো কেটে সরাসরি অর্থ ও ফলপ্রদান কারী দ্রুত বর্ধনশীল গাছ গুলো লাগানো হয়৷ কিন্তু কেউ কি এই বুনো গাছ গুলো লাগায়? যা খেয়ে বুনো পশু, পাখিরা টিকে থাকবে?

মানুষের কারণে ধ্বংস হচ্ছে অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল।

গ্রামে একসময় ছিলো শিয়ালসহ বিভিন্ন মাংসাশী প্রাণীর বসবাস৷ বনের রোগাক্রান্ত পশুপাখি, জলাশয়ের অসুস্থ মাছ খেয়ে মহামারী থেকে রক্ষা করতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বন  বিড়াল, মেছোবাঘ, চিতা বিড়াল, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন প্রাণীদের আবাসস্থল কমেছে। ভ্রান্ত ধারণা বেড়েছে আর বেড়েছে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘর্ষ। 

প্রাকৃতিক পরিবেশ, বুনো খাবার, হারিয়ে এরা ঢুকে পড়ছে মানব বসতিতে। প্রকৃত পক্ষে মানুষ জোর করে ঢুকে পড়ছে তাদের আবাসস্থলে। ক্রমাগতই ব্যাপকভাবে কমছে এই প্রাণীদের সংখ্যা যারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় এরা রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফলাফল স্বরূপ পরিবেশে ঘটছে বিপর্যয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজেই হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। 

আমাদের আশেপাশের বনের পাখিদের কি খবর? আমরা কতটা রাখি পরিবেশের সুন্দরতম আর উপকারী এই প্রাণীদের কথা। খাঁচায় আটকাতে পারলেই তো আমরা মহাখুশি হই এই প্রাণীদের। কিন্তু আমাদের অগোচরে কত উপকারী পাখি ইতিমধ্যে আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে আমরা হয়তো তা জানিও না।

উদাহরণ স্বরুপ আগে সিপাহী বুলবুল সারাদেশে সব জায়গায় মোটামুটি সহজেই দেখা যেত, কিন্তু আমাদের আশপাশ থেকে আমাদের অজান্তেই এই পাখিটি হারিয়ে গিয়েছে অনেক স্থানে। 

আগের মতো, পেঁচা, বা শিকারী পাখিদের কি দেখা যায়? ছোট সুন্দর মৌটুসী পাখি, শ্বেতাক্ষী কি আগের মত আঙিনায় উড়ে? শ্যামার গান কি আগের মতো শোনা যায়? বাবুই এর বাসা কি আগের মতো দেখা মেলে? অনেকেই হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের প্রকৃতিক আবাসস্থল, বুনো পরিবেশ আর খাবার সরবারহ আর আগের মতো নেই। 

তারপরে ধরুন ছোট উপকারী বন্ধু ব্যাঙের কথা, যারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, মশা খেয়ে এতকাল মানুষকে রক্ষা করছে। শহুরে মানুষ হয়তো ঠিকই বুঝতে পারছে, যখন বর্ষাকালে মশাবাহিত রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

এভাবেই কমে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের জীব বৈচিত্র্য। এর ফলে ভুক্তভোগী কিন্তু শুধু জীব বৈচিত্র্য নয় মানুষ সব থেকে বেশি। 

আর পরিবেশের সাথে বিরূপ আচরণ করে মানুষ কখনোই ভালো থাকতে পারে না। যে পরিবারে শিশুরা বুনো পাখি খাঁচায় আটকে রেখে আনন্দ পাওয়া শেখে, পাখি শিকার করে আনন্দ পাওয়া শেখে পরিণামে তারা কোনদিনও মায়া, মমতা বা সম্পূর্ণ সুশিক্ষা নিয়ে বড় হয়না। যার ফলে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার মানুষিক বিকৃতিও হয়।

এখন যদি প্রশ্ন রাখা হয়!  জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনের দায়িত্ব কার? উত্তর হওয়া উচিত প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবার এবং সমন্বিতভাবে। শুধু সরকার, শুধু ব্যক্তি, শুধু গবেষক, শুধু সংস্থা  কেউ একা এই জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে পারবে না। দরকার সকালের সম্মেলিত প্রচেষ্টা। আর এই প্রচেষ্টা শুরু হোক নিজের আশেপাশের জীব বৈচিত্র্যের সংরক্ষণের মাধ্যমে।

-লেখক, বন্যপ্রাণী বিষয়ে গবেষণারত ছাত্র, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওয়াইল্ড লাইফ ইকোলজিস্ট, সিইজিআইএস, বাংলাদেশ। 

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: