• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯

আবাহনীর মাঝেই বেঁচে থাকবেন শহীদ শেখ কামাল

সাইফুর রহমান চৌধুরী

প্রকাশিত: ০১:২৭, ৫ আগস্ট ২০২২

ফন্ট সাইজ
আবাহনীর মাঝেই বেঁচে থাকবেন শহীদ শেখ কামাল

বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের পথিকৃত শেখ কামাল ছিলেন একজন ভার্সেটাইল ব্যক্তিত্ব। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে সাড়ে তিন বছরে যে দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তা অনন্য। ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এশিয়ান মানে নেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, নিয়েছিলেন নানা উদ্যোগও। 

তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে চিরস্মরনীয় হয়ে রয়েছেন, তার প্রিয় ক্লাব আবাহনীকে দেশ সেরা ক্লাবে পরিণত করে। আর তারুণ্যের প্রতীক হয়ে ওঠা আবাহনীকে নিয়ে তার স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নের মধ্যেই একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে শেখ কামাল বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন, পেয়েছেন অমরত্ব।

বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল মাত্র ২৪ বছর বয়সেই হাল ধরেছিলেন এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের, বিশেষ করে আবাহনীর। নিজে একজন অ্যাথলেট ছিলেন। অ্যাথলেটিক্স ছাড়াও ফুটবল, বাস্কেটবল, ক্রিকেট খেলেছেন। ছিলেন খেলা অন্তঃপ্রাণ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দিয়েছিলো আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। তখন শেখ কামাল ও শেখ জামাল দুই ভাই জড়িত ছিলেন ধানমন্ডি ক্লাবের সাথে। বর্তমানে যা শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব নামে প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে খেলছে। 

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধু শেখ কামালকে বলেন, আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতির সাথে জড়িত হতে। সেই শুরু শেখ কামাল ও আবাহনীর বন্ধন।  

৭২ সালে ‘ক্রীড়া চক্র’ হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও আবাহনীর স্বপ্নের বীজ বপন হয় আরো আগে। ১৯৬৬ সালে ধানমন্ডির একঝাক মুক্তি পাগল তরুণ গড়ে তোলে আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। মূলত ক্লাবের বর্তমান মাঠটিকে আবাসন শিল্পের হাত থেকে রক্ষার জন্যই তাদের সেই যুদ্ধের শুরু। 

গোলাম আউয়াল তালুকদারকে আহবায়ক ও হারুনুর রশিদ’কে সদস্য সচিব করে গড়ে তোলা হয় আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। খুব দ্রুতই ঐ কমিটি এলাকায় সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য স্থান করে নেয় এবং স্থানীয় মুরুব্বিরাও তাদের সমর্থন করায় ডিআইটির বিপক্ষে লড়াই করে আবাসন শিল্পের হাত থেকে খেলার মাঠটিকে রক্ষা করতে সমর্থ হয় । 

শেখ কামাল ক্লাবের সাথে যোগ দেয়ার পর ১৯৭২ সালে নতুন উদ্যোমে শুরু হয় আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতির যাত্রা। শুরুতে সমিতির মূল লক্ষ্য ১. সমাজ কল্যাণ  ২. ক্রীড়া চক্র ও ৩. সাহিত্য সংঘ হলেও; স্বাধীনতার পর শুধু খেলাধুলাকেই প্রাধান্য দিয়ে সমাজ কল্যান থেকে ক্রীড়া চক্রে পরিণত হয়ে আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামে বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন দিগন্তের সূচনা করে। 

ক্লাবের প্রথম ও প্রতিষ্ঠতা সভাপতির দায়িত্ব পান কাজী নাজিমুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হারুনুর রশিদ। যদিও শেখ কামালই ছিলেন ক্লাবের প্রাণ পুরুষ এবং তাঁকে ঘিরেই শুরু হয় আবাহনীর নতুন পথ চলা। ভাইকে অনুপ্রাণিত করতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জড়িয়ে যান আবাহনী ক্লাবের সাথে ।

শেখ কামালের আগমনে আবাহনীর পথ চলার দূরন্ত গতি পায়। স্বাধীনতার আগে ৬৯-৭০ সালে বিহারী ও পাকিস্তানপন্থিদের নিয়ে গড়া মোহাম্মদপুরের ইকবাল স্পোর্টিং  দ্বিতীয় বিভাগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে উঠেছিলো। কিন্তু দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় বিহারীদের পক্ষে আর ইকবাল স্পোর্টিং ক্লাবকে পুনর্গঠন সম্ভব হচ্ছিল না। তখন আবাহনীর কর্মকর্তারা সমোঝোতার মাধ্যমে ইকবাল স্পোর্টিংকে আবাহনীর সাথে সম্পৃক্ত করে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে খেলার সুযোগ করে নেন। 

যদিও ’৭২ সালে ফুটবল লিগ শুরু হলেও বাফুফে পুনর্গঠিত না থাকায় নানা সমস্যায় শেষ হয়নি লিগ। পরের বছর শেখ কামালের নেতৃত্বে গোলাম সারোয়ার টিপু, আবদুস সাদেক, সালাউদ্দিন, আশরাফ, অমলেশ সেনদের নিয়ে ভালো একটি দল গড়ে আবাহনী। 

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম লিগ রেসে চ্যাম্পিয়ন (বিজেআইসি ) হতে না পারলেও, মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্স এর সাথে যৌথভাবে রানার্সআপ হয় আবাহনী। রাতারাতি এদেশের ক্রীড়াপাগল তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে যায় আবাহনীর আগমনী বার্তা। আকাশী নিলের প্রাণবন্ত ফুটবল সমর্থদের মন কাড়তে শুরু করে। আর একথা বলাই বাহুল্য যে এসবের মূল প্রেরণাই ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক হয়ে ওঠা শেখ কামাল।  

১৯৭৪ সাল ক্লাবের ইতিহাসে স্মরনীয় হয়ে রয়েছে ফুটবল লিগে প্রথম শিরোপা জয়ের জন্য। ঐ বছর মোনোয়ার হোসেন নান্নু, সামশু ভাইদের মত ফুটবলাররা যোগ দেয় আবাহনী শিবিরে। আবাহনীকে ঘিরে একঝাক তরুণ ফুটবলারের নৈপূণ্যে মুখরিত হয়ে উঠে  বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গন।  

একই সাথে ক্রিকেট ও হকিতে দেশসেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে শক্তিশালী দল গড়ে আবাহনী। ফলে ঐ মৌসুমে ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি লিগের শিরোপা জিতে অসাধারণ ট্রেবল জয় করে আবাহনী। শুধু তাই নয়, ঐ বছর টেবিল টেনিস লিগেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো ধানমন্ডির ক্লাবটি।  

মূলত ঐ বছরটি আবাহনীর ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট। আবাহনী ক্রীড়া চক্রের সগৌরবে পথ চলার মূল ভিত্তি হচ্ছে ’৭৪ সালের সাফল্য। ক্লাবের এমন সাফল্যে দারুণভাবে উজ্জীবিত হন শেখ কামাল। তিনি ফুটবলে আরো উন্নতি করতে ঐ বছরই  ইংল্যান্ড থেকে উইলিয়াম বিল হার্টকে কোচ হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন, এই ইংলিশ কোচের অধিনে আবাহনীর খেলার ধরণ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়, প্রাণবন্ত কৌশলে জেগে ওঠে বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গন।  

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ কামালকে ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ক্লাবকে আরো সংগঠিত করার পরিকল্পনা নেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু ঐ বছরটি আবাহনীর জন্য হয়ে রয়েছে ট্র্যাজিক অধ্যায়। দুই মেয়েকে ছাড়া স্ব-পরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু।  

বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামালের মৃত্যুর পর কঠিন সময় পার করতে হয়েছে আবাহনীকে। মাঠে দল নামাতেও হিশশিম খেতে হয়েছে। তখন মোহামেডানের কর্মকর্তারাসহ দেশের ফুটবল সংগঠকরা আবাহনীর পাশে দাঁড়ালে, নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয় আবাহনী। বিক্ষুদ্ধ সমর্থকদের এড়াতে ফুটবল ম্যাচে বাইতুল মোকারম মসজিদের উত্তর দিকে মোহামেডানের গেট দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছে আবাহনী দল। 

এভাবেই শেখ কামালকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন উদ্যোমে পথ চলেছে আবাহনী। ১৯৭৭ সালে ফুটবল লিগে অপরাজিত শিরোপা জিতে দারুণভাবে ঘুঁড়ে দাঁড়ায় নীল-হলুদের প্রতীক হয়ে ওঠা দলটি। এরপর আবাহনীকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: