• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

পাঠ্যপুস্তকের ভুলে লাভ কার!

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

প্রকাশিত: ১৫:২৫, ২১ জানুয়ারি ২০২৩

ফন্ট সাইজ
পাঠ্যপুস্তকের ভুলে লাভ কার!

পাঠ্যপুস্তকের পুরো ব্যাপারটাই একতরফা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিবাবকরা এর শিকার। সন্তানদের লেখাপড়া ও মানুষ হবার প্রক্রিয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হয় এনসিটিভির মর্জির ওপর। জাত আমলা এবং শিক্ষক-আমলারা যা বানিয়ে দেন,  তা-ই গেলাতে হয় সন্তানদের। সেই ধারায় এবার নতুন পাঠ্য বইয়ের ভুল-ভ্রান্তি, নকলবাজি ও আজগুবি কনটেন্টের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা, ধোলাই-মালাই হয়েছে যথেষ্ট। আধুনিক প্রজন্ম গড়ে তোলার উপাদান এই পুস্তকগুলোতে আছে কিনা – সেই আলোচনাও চলছে। অপরিপক্ক শিক্ষানীতি, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া, তারওপর লেজেগোবরে পাঠ্যক্রম ক্ষেত্রবিশেষে উদ্ভটও। কোথাও কোথাও উৎকট। বছর শেষে তা সহ্য করা কি নিয়তি? নইলে কেন পাঠ্যক্রম স্থিতিশীল করা হয় না? কেন বছর বছর পাঠ্যপুস্তকে মনগড়া পরিবর্তন? সেই ধারাবাহিকতায় এবার আরো বিতিকিছছিরি অবস্থা। পুরান ভুলের সাথে নতুন ভুল মিলিয়ে গুরুচরণ দশা করে ফেলা হয়েছে শিশু-কিশোরদের বইগুলো। 

 

পুস্তক প্রণয়নের কাজে প্রতিবছর চিহ্নিত কয়েকজনকেই বেছে নেয় সরকার। তারা তাদের পছন্দের কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সাথে নিয়ে তৈরি করে দেন বিভিন্ন চোথা। এ বাবদ পান লাখ-লাখ টাকার সম্মানী। সেসব পাঠ্যপুস্তক ভুল হলে বা বই-কারিকুলাম এক বছর চালিয়ে বাতিল করে দিলে মন্ত্রী, আমলা-কর্মকর্তা ও লেখকদের ক্ষতি হয় না। বরং আরো লাভ হয়। তাদের গড়লেও লাভ, ভাঙলেও লাভ। ভুলভাল হলে সেই তারাই আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আরেক প্রস্থ পুস্তক প্রণয়নের। আবার লাখ-লাখ টাকা প্রাপ্তি। শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কার। সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সেখানে কেবল গিনিপিগ। চলে আসছে এভাবেই। এমনিতেই শিক্ষার্থীরা এখনো সব বই হাতে পায়নি। তারওপর এবার শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীরা পেয়েছে দু’ধরনের বই । প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পেয়েছে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে। অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে বই হাতে পেয়েছে। পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণয়ন করা বইগুলোর মধ্যে কোনো বইয়ে আগের ভুলভ্রান্তি রয়ে গেছে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও গণহত্যাবিষয়ক অংশে প্রথম লাইনে বলা হয়েছে, ‘২৬ শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছিল।’ প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাত থেকেই নিরীহ বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। আরেকটি বাক্যে বলা আছে ২৫ মার্চের রাতে অত্যাচারের কথা। প্রথম লাইনটি চরম বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের কাণ্ড ভুরি ভুরি এবার। 

নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ২০০ পৃষ্ঠায় একটি অংশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার ধরন কী হবে, এই সম্পর্কে তখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিনই ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভায় দীর্ঘ আলোচনার পর “অস্থায়ী সংবিধান আদেশ” জারির মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত সায়েমের নিকট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। একই দিনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।’

একেকটি বইয়ে লেখক-সম্পাদক হিসেবে ১০-১৫ জনের নাম পর্যন্ত দেখা যায়। প্রকাশের আগে তা দেখতে কয়েকজন বিষয়-বিশেষজ্ঞের কাছেও পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন উচ্চতর কর্তাব্যক্তির কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার একটি পর্বও আছে। এরপরও পাঠ্যবইয়ে ভুল থাকে। প্রতিবছর নতুন বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এসব ভুল নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এবার তা মাত্রা ছাড়ানো। বিশেষ করে ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির সমাজ বইয়ের ভুলগুলো নতুন করে আর উল্লেখ করার দরকার নেই। এরইমধ্যে তা প্রায় সবার জানা হয়ে গেছে। কোনো কোনোটি কোনোভাবে মেনে নেওয়ার মতো নয়।
প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে বইয়ের তথ্য সব সময় প্রামাণ্য নয়।  কবি জসীমউদ্‌দীনের জন্ম কত সালে কিংবা তাঁর নাম কোন বানানে লিখতে হবে, এটি পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বই দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একেক শ্রেণির বইয়ে তা একেকভাবে লেখা। তথ্যগত অসংগতির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়। এই দ্বিধা ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। গুরুতর সমস্যা তথ্যগত ভুল নিয়ে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্যেও ভুল । তা কি শ্রেণি উপযোগী? যে ভাষায় দেওয়া হয়েছে তা কি উপযোগী? মন্ত্রী, আমলা ও বইয়ের লেখকদের ছেলেমেয়েরা এই বই পড়বে?

চৌর্যবৃত্তির কারবার পর্যন্ত ঘটেছে এবার। একাডেমিক ভাষায় এক বলে প্লেইজারিজম। সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান দুটি বই রয়েছে। ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের (তৃতীয় পৃষ্ঠা) শুরুতে তুলে ধরা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য কী। পাঠ্যপুস্তকটিতে লেখা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য শব্দ দ্বারা পৃথিবীতে জীবনের বিপুল বৈচিত্র্য বর্ণনা করা হয়। জীববৈচিত্র্য বলতে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীবসহ সকল জীবের মধ্যে বিদ্যমান বৈচিত্র্যকে বোঝায়। পৃথিবীতে ঠিক কত সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন জীব আছে, তা নিশ্চিত করে এখনো আমাদের জানা নেই। তবে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে, প্রায় ৮-১৪ মিলিয়ন (৮০ থেকে ১৪০ লক্ষ) বিভিন্ন প্রজাতির জীব এই পৃথিবীতে রয়েছে। কারও কারও ধারণা মতে, সংখ্যাটা আরও বেশি। তবে সংখ্যা যা–ই হোক না কেন, এসব জীবের বেশির ভাগই আমাদের অজানা। এখন পর্যন্ত মাত্র ১.২ মিলিয়ন (১২ লক্ষ) প্রজাতি শনাক্ত এবং বর্ণনা করা হয়েছে, যার অধিকাংশই অবশ্য পোকামাকড়। এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কোটি কোটি অন্যান্য জীব এখনো আমাদের কাছে রহস্যময়, অজানা।

আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সুন্দরভাবে তুলে ধরা হলে, এটি যেখান থেকে লেখকেরা তুলে এনেছেন, তার সূত্র মূল লেখায় উল্লেখ না করা হলেও, কয়েক মিনিটে গুগলে বলে দিচ্ছে, এই কয়েকটি বাক্য হুবহু ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডট ওআরজি থেকে নেওয়া হয়েছে। এমন ভুল ও অসংগতিতে ভরা বই, মূলত শিশুদের হাতে বই নয় বিষ তুলে দেওয়া হচ্ছে । 

এবার পাঠ্যবইয়ের মানও আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, নানা জটিলতায় শেষ সময়ে বই পাওয়ার জন্য এবার মানে ছাড় দেওয়া হয়েছে। বই ছাপার সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্রগুলো বলছে, ভালো মানের পাল্পের (কাগজ তৈরির মণ্ড) সংকটের অজুহাতে বইয়ের উজ্জ্বলতার ক্ষেত্রে ‘অলিখিতভাবে’ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিছু কিছু মুদ্রণকারী ‘অতি নিম্নমানের নিউজপ্রিন্ট জাতীয় কাগজ’ দিয়ে বই ছাপিয়েছে। এগুলো আসলে এক ধরনের অজুহাত। ভেতরের খবর হচ্ছে, আসলে এবার মান দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে সংখ্যা। পাঠ্যপুস্তকের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে ভুল–ত্রুটি অনাকাঙ্ক্ষিত-অমার্জিত। এরপরও গত বছর কয়েক ধরে তা মামুলি ঘটনায় রূপ নিয়েছে। পাঠ্যপুস্তক দেখভালের দায়িত্বে থাকা মানুষজন কখনো সেগুলো আমলে নেন, আবার কখনো নিজেদের ভুল স্বীকারই করেন না। এবার অন্তত ভুল স্বীকারের একটুআধটু সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কিছু সংশোধনীও দেয়া হয়েছে। তাও অন্তত মন্দের ভালো। ভবিষ্যতে এসবের পুনরাবৃতি না ঘটুক।


লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলা পোস্ট 
 

মন্তব্য করুন: