• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নীতিমালা উপেক্ষা করে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের মনমতো হলের সিট বরাদ্দ

প্রকাশিত: ১৫:৪৪, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৫:৪৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
নীতিমালা উপেক্ষা করে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের মনমতো হলের সিট বরাদ্দ

কাগজে-কলমে সিট বরাদ্দের নীতিমালা থাকলেও ঢাকা কলেজের আবাসিক হলগুলোতে সিট বণ্টনের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী মেধা, ক্লাসে উপস্থিতি, বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ও আর্থিক অসচ্ছলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের মনমতো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে এসব তথ্য ওঠে এসেছে।

গত ২৪ আগস্ট ঢাকা কলেজের আবাসিক হলগুলোর সিট বরাদ্দের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকা প্রকাশের পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে। নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করেও অনেক শিক্ষার্থী সিট পাননি বলে দাবি করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এমনকি ছাত্রদলের কয়েকটি গ্ৰুপের নেতাকর্মীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিট বরাদ্দের জন্য প্রথমে বিভাগীয় প্রধান সহ ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরবর্তীতে ওই কমিটির মাধ্যমে, যারা হলে সিট বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছিল তাদের ভাইবা নেওয়া হয়। ভাইভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থাসহ নীতিমালার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিভাগ থেকে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে। পরে ওই তালিকা কলেজ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়।

তবে বিভাগগুলো থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক। তাদের দাবি, বিভাগীয় তালিকা থেকে মাত্র একজন-দুজন শিক্ষার্থীকে রেখে বাকি সিটগুলো অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পছন্দের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকের ক্লাসে উপস্থিতি নাই বললেই চলে। আবার তাদের একাডেমিক ফলাফলও খারাপ। 

এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের সিট বন্টনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রশাসনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তাদের বিভিন্নভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সিট বরাদ্দের বিষয়ে বিভাগের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের বাইরে কারও সঙ্গে কথা না বলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে আবাসিক হলের সিট বরাদ্দের জন্য প্রাথমিক তালিকায় ছয় শিক্ষার্থীর নাম পাঠানো হয়েছিলো। তারা হলেন—২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের নয়ন আলী ও রেদোয়ান আহমেদ এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মো. শাহীন আলম, রেজাউল করিম, এস এম নাজমুল হাসান ও মো. নাইমুর রহমান।

তবে বিভাগ থেকে পাঠানো ওই প্রাথমিক তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত সিট বরাদ্দের তালিকায় বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত তালিকায় মনোবিজ্ঞান বিভাগ থেকে চারজন শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রাথমিক তালিকায় থাকা ছয় শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু প্রথমজন নয়ন আলী সিট পেয়েছেন।

প্রাথমিক তালিকায় থাকা বাকি পাঁচ শিক্ষার্থীর কেউই চূড়ান্ত তালিকায় সিট পাননি। তাঁদের পরিবর্তে সিট বরাদ্দ পেয়েছেন ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মো. মোজাহিদুল ইসলাম সাবির ও আসাদুজ্জামান বিপ্লব এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মো. সোহেল রানা।

শুধু মনোবিজ্ঞান বিভাগেই নয়, একই ঘটনা ঘটেছে গেছে ঢাকা কলেজের অন্যান্য বিভাগেও, যার একাধিক তথ্য এই অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। তথ্য বলছে, বাংলা, ইংরেজি, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগসহ একাধিক বিভাগ থেকে পাঠানো প্রাথমিক তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত সিট বরাদ্দের তালিকার মিল পাওয়া যায়নি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, যারা হলে সিট বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছিল তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেই, সেখান থেকে কয়েকজনের নামের একটি প্রাথমিক তালিকা কলেজ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়। যারা আর্থিক ভাবে অসচ্ছল ও মেধাবী, বাহিরে থাকার মতো সামর্থ্য নেই তাদেরকেই প্রাথমিক তালিকায় নাম দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু যখন সিট বরাদ্দের চূড়ান্ত তালিকা কলেজ থেকে প্রকাশ করা হয় সেখানে এমন অনেক শিক্ষার্থীর নাম দেখা যায়, যাদের নাম প্রাথমিক তালিকায় ছিল না। 

শিক্ষকদের অভিযোগ, সিট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিলো। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও পছন্দের শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ওই শিক্ষকদের।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ বছর কলেজটির সাতটি ছাত্রাবাসে মোট ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন আহ্বায়ক কমিটির সদস্যও রয়েছেন।

এদিকে, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনামূলকভাবে কম সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সিট দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে বেশ কয়েকজনের তালিকা পাঠিয়েছিলাম। তবে এখন নিয়মটা এমন-আমি যতজনের নামই পাঠাই না কেন, শেষ পর্যন্ত কলেজের অধ্যক্ষ যাকে সিট দিবে তারাই পাবে।

তিনি আরও বলেন, অধ্যক্ষের ওপরও বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ থাকে। ওপরের লোকের চাপ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপ থাকে। বিষয়টা বাইরে থেকে দেখলে হয়তো বোঝা কঠিন। কিন্তু আপনি যদি ওই জায়গায় বসতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, পরিস্থিতিটা আসলে কতটা চাপের।

এছাড়া ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির এক সদস্য জানান, ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেনের মাধ্যমে তিনি সিট বরাদ্দ পেয়েছেন। আর মিল্লাদ গ্ৰুপের নেতাকর্মীরাই বেশি সিট পেয়েছে বলে জানান ওই নেতা।

এ বিষয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাত হোসেন জানান, হলের সিট বণ্টনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা তাদের ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি বলেন, "দ্বিতীয়ত কথা হচ্ছে কোনো পলিটিক্যালি কোনো দেওয়া হয় নাই কাউকে এবং আমাদের আমি অথবা আমার সভাপতি পিয়াল ভাই আমাদের কারও মতামতের ভিত্তিতে কোনো দেওয়া হয় নাই। সবাই ডিপার্টমেন্টকেন্দ্রিক তাদের ডিপার্টমেন্ট থিকা কলেজের যে প্রক্রিয়া রয়েছে, প্রশাসনিক যে সিস্টেম রয়েছে, ওই সিস্টেম অনুযায়ী এবং তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিপার্টমেন্ট থেকে তাদেরকে সিট দেওয়া হইছে।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সিট পাওয়ার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, স্টুডেন্টেরা যাদের দেওয়া হইছে তারা তো স্টুডেন্ট এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবেই তো তাদের দেওয়া হইছে। এবং সে স্টুডেন্ট যদি ছাত্রদলের কর্মীও হয়ে থাকে, এটা তো তার অপরাধ না। সিট দেওয়া হইছে ১১৫ টা। এর মধ্যে গিয়া আপনারা দেখেন ছাত্রদল করে কয়ডা কর্মী, আর সাধারণ শিক্ষার্থী, এমন কি শিবির বা ছাত্রশক্তি করে তারাও তো সিট পেয়েছে। এটা তো আসলে ভাগ করে দেওয়া হয় নাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আনোয়ার মাহমুদ বলেন, হলে সিট বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি শুধু আমার একার সিদ্ধান্তে হয় নাই। হোস্টেল সুপার ও কলেজ প্রশাসন সম্মিলিতভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে। তাই এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা অভিযোগ থাকলে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে তার জবাব দেব। এককভাবে আমার পক্ষে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া বা জবাব দেওয়া সমীচীন হবে না। এ সংক্রান্ত যেকোন বিষয়ে অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে কথা বলবেন-এমন সিদ্ধান্তই হয়েছে।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম ইলিয়াস বলেন , এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এগুলোর কোনো সত্যতা নেই। রাজনৈতিক কোনো প্রভাবে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, গতবারের তুলনায় এবার বরাদ্দযোগ্য সিট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এবার ১৫০০ জন প্রার্থীর চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১১০টি সিট থাকায় সিট বরাদ্দ নিয়ে সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। একই সাথে বিভাগের সুপারিশ করা তালিকা সম্পূর্ণ নির্ভুল না হলেও তালিকার ভেতর ও বাইরে উভয় স্থান থেকেই শিক্ষার্থীরা সিট পেয়েছে। আর দুই-একটা ভুলভ্রান্তি হয়েছে যেগুলো আমরা সংশোধন করছি।

বিভি/এআই

মন্তব্য করুন: