অনাবাদী জমিতে কলা চাষে স্বাবলম্বী টাঙ্গাইলের কৃষকেরা
উপযোগী মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে টাঙ্গাইল জেলায় দিন দিন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে কলার আবাদ। পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও কলা চাষ সৃষ্টি করেছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ন্যায্যমূল্য ও লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ১২টি উপজেলাতেই কম-বেশি কলার চাষ হলেও পাহাড়ি এলাকা ও যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের পাহাড়ি অঞ্চল এবং ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতীর চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি কলার বাগান।
অমৃতসাগর, মেহেরসাগর, চম্পা ও সবরি কলার পাশাপাশি কাঁচকলার চাষেও লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। আগে যেসব পাহাড়ি জমি ও চরের পলিমাটি অনাবাদী পড়ে থাকত, সেখানে এখন সবুজ কলার বাগান গড়ে তুলে স্বাবলম্বী হয়েছেন শত শত কৃষক। কম খরচ ও স্বল্প পরিশ্রমে ভালো ফলন ও মুনাফা পাওয়া যায় বলে প্রতিবছরই এ অঞ্চলের নতুন নতুন কৃষক কলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
এখানকার উৎপাদিত কলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন নদী ও সড়কপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে যাচ্ছে।
কলা চাষের অর্থনৈতিক হিসাব ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্থানীয় চাষি মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, “প্রতি ছড়িতে জমির লিজসহ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ পড়ে। বিক্রির সময় সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪৫০, ৫০০ এমনকি ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। তবে ২০০ টাকা খরচ করে ৪০০ টাকায় বিক্রি করলেই পুরো ২০০ টাকা লাভ হিসেবে ধরা যাবে না। কারণ, এক বিঘায় যদি ৩৫০টি কলার গাছ লাগানো হয়, বিক্রির সময় সবগুলো বিক্রি করা সম্ভব হয় না। প্রায় ৫০টি গাছের ক্ষতি ধরেই হিসাব করতে হয়।”
দীর্ঘদিন ধরে কলা চাষ করে আসা আরেক কৃষক কছর উদ্দিন বলেন, “কলা চাষ বেশ লাভজনক। আমি ২০০৭ সাল থেকে কলা আবাদ করছি। বর্তমানে দুই একর জমিতে আমার বাগান রয়েছে। এ বছর আরও তিন একর বাড়াচ্ছি। অনেক বছর ধরে চাষ করছি, এখন পর্যন্ত লাভজনকই মনে হয়েছে। তবে সিগাটোকা রোগের আক্রমণ রয়েছে। এ রোগে পাতাগুলো মরে লাল হয়ে যায়। রোগের আক্রমণ না হলে চাষে ভালো লাভ হয়। প্রতি পিসে প্রায় ২০০ টাকা খরচ পড়ে, আর আমি আমার বাগানের কলা ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি।”
একই এলাকার অপর কলাচাষি জহিরুল ইসলাম কলার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেন, “আমাদের এলাকায় কলা চাষ অনেক লাভজনক। ঝড়-বৃষ্টি, তুফান কিংবা পোকামাকড়ের আক্রমণ না হলে ভালো অঙ্কের টাকা লাভ করা যায়। আমি প্রায় তিন পাখি জায়গায় কলার আবাদ করছি। এবার মোটামুটি ভালোই লাভ হয়েছে।”
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, “টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে মেহেরসাগর, অমৃতসাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক আবাদ হয়। বিশেষ করে ঢাকার কলার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায় মধুপুরের মেহেরসাগর কলা। কৃষকদের উন্নত ও ভালো জাত সরবরাহের জন্য আমরা কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক প্রকল্প পরিচালনা করছি। এ ছাড়া যেসব জমিতে পানামা বা সিগাটোকা রোগের প্রকোপ দেখা দেয় কিংবা চাষে ক্ষতি হয়, সেখানে কৃষকদের বিকল্প হিসেবে পেঁপে, আখ ও তরমুজ চাষের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কলার আবাদ টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। তবে কৃষকেরা যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং রোগবালাইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য সরকারি তদারকি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও হিমাগার স্থাপন করা গেলে টাঙ্গাইলে উৎপাদিত কলা স্থানীয় ও জাতীয় চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: