ইরানে হামলা-খামেনির মৃত্যু: ক্ষমতাধর দেশগুলোর কার কী অবস্থান?
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। গত তিন দিনে পাল্টা-পাল্টি হামলায় উভয়পক্ষের বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহাণির সংখ্যা ইরানেই বেশি বলে জানা যাচ্ছে। দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সেখানে সাড়ে পাঁচশ'র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির প্রায় চার ডজন নেতা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অন্যদিকে, ইরান অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। আরও বেশ কয়েকজন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া ইসরায়েলের নয়জন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দেশটির সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
এদিকে, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের বর্তমান নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও সেটি উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানি বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করবেন না।
অন্যদিকে, সামনের দিনগুলোয় তেহরানের ওপর হামলার মাত্রা 'আরো বাড়নো হবে' বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ফলে এই যুদ্ধ সহসাই থামবে না বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
যদিও উভয়পক্ষের পাল্টা-পাল্টি হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্প্রদায়। চলমান সংঘাত থামানো না গেলে সেটি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
কিন্তু এই যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া কী?
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে জড়িত নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে হামলায় যুক্তরাজ্য যোগ দেবে না বলেও জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার।
তবে ওই হামলার জবাবে ইরানের 'বাছবিচারহীনভাবে হামলার' কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকদের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাইপ্রাসের একটি আরএএফ ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে রোববার রাতে "সন্দেহভাজন ড্রোন হামলা" করা হয়েছে। যদিও এই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, "এই অঞ্চলে আমাদের সুরক্ষা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং আমাদের কর্মীদের রক্ষা করতে ঘাঁটি থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।"
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্য যেসব দেশের ওপর হামলা করেছে, সেসব দেশ ইরানের ওপর হামলায় জড়িত ছিল না।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার।
চীন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেভাবে হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে, তাতে 'তীব্র নিন্দা' জানিয়েছে চীন। সকল পক্ষকে সংযত হয়ে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে "ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী" বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়া
ইরানের ওপর হামলার ঘটনায় চীনের মতো রাশিয়াও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একইসঙ্গে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রোববার রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
তিনি খামেনির মৃত্যুকে 'মানবিক নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সকল নিয়ম লঙ্ঘনকারী নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড' বলে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের ওপর হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেটি ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে মস্কো।
জার্মানি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরান যেভাবে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, সেটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জার্মানি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেডিওকে জার্মানির রাজনৈতিক ও সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের মধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরানের হামলা বন্ধ না হলে দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে জার্মানি।
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্যরা রেডিওটিকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই চলছে। এতে বিমান হামলায় অংশগ্রহণ এবং সামরিক ও আকাশপথে সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফ্রান্স
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স। দেশটির সরকারের একজন মুখপাত্র মুদ বোজো রোববার এ কথা জানান।
ফ্রান্সের আরটিএল টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে তিনি বলেছেন, "খামেনি ছিলেন একজন নিপীড়ক ও দমনমূলক একনায়ক, যিনি তার নিজ দেশের জনগণকে দমন করেছিলেন।"
"নারী, যুব ও সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন করেছিলেন এবং সম্প্রতি দেশটিতে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তাই তার মৃত্যুতে আমরা শুধু উৎফুল্ল হতে পারি," বলেন ফ্রান্স সরকারের অন্যতম মুখপাত্র মুদ বোজো।
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের "স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে" ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।
এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা হলে তা সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে উত্তেজনা বাড়তে থাকা 'সবার জন্যই বিপজ্জনক'।
তবে ম্যাক্রঁ এটাও পরিষ্কার করেছিলেন যে, তাদের বন্ধুদেশগুলো যদি অনুরোধ করে, তাহলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ফ্রান্স প্রস্তুত থাকবে।
অন্যরা কী বলছে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বর্তমান পরিস্থিতিকে 'বিপজ্জনক' আখ্যায়িত করেছেন। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইইউ ইরানের ওপর আগেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং পারমাণবিক ইস্যুসহ সব বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়টিকে সমর্থন দিয়েছে।
কাজা কালাস বলেন, তিনি ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা 'সবচেয়ে জরুরি' বলে মন্তব্য করেছেন কাজা কালাস।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, উত্তেজনা কমাতে তারা মিত্র ও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপকে তারা সমর্থন দিয়েছেন।
এদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে বিবেচনাশক্তি না হারিয়ে উত্তেজনা কমানোর এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার অনুরোধ করেছেন।
'যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে সব সময় সাধারণ মানুষকেই চরম মূল্য দিতে হয়' বলে মন্তব্য করেছেন ফলকার টুর্ক। আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: