‘বালুচরে কুড়ানো স্বপ্ন’
এক
নদীর চরে যখন বাতাস বয়, তখন সেই বাতাসে ঝাউবনের শনশন শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। চর খেওয়ার আলগা জায়গাটা এমনিতেই কেমন যেন অলৌকিক ধরনের নির্জন। একদিকে ব্রহ্মপুত্রের ধূ ধূ জলরাশি, অন্যদিকে দিগন্তজোড়া অন্তহীন বালুচর। দুপুরবেলা সেই বালুচরের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয় পৃথিবীটা বুঝি জনমানবহীন এক বিশাল নিঃসঙ্গ গ্রহ। এই বিশাল বালুচরের ঠিক মাঝখানে ছোট একটা টিনের ঘর দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটির সামনে একখানা কাঠে খোদাই করা সাইনবোর্ড—'খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান সাহেব প্রতিদিন সকালে স্কুলে এসে প্রথমে টিনের চালের দিকে তাকান, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আতাউর সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। চরের এই ছোট স্কুলটায় তিনি একাই প্রায় সবকিছু। স্কুলে টিনের ঘর আছে, বেঞ্চ আছে, কালো রঙের ব্ল্যাকবোর্ডও আছে; কিন্তু যা সবচেয়ে বেশি থাকা দরকার—অর্থাৎ খাতা-কলম আর পেন্সিল—সেসব চরের শিশুদের কাছে ভীষণ দুর্লভ বস্তু।
চরের মানুষগুলোর কাছে তিন বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়াটাই যেখানে এক বিরাট জীবনসংগ্রাম, সেখানে বাচ্চাদের জন্য নতুন খাতা বা রঙিন পেন্সিল কেনাটা এক ধরনের রূপকথার বিলাসিতা।
পঞ্চম শ্রেণির ছেলে সিয়াম অবশ্য বিলাসিতা শব্দটার অর্থ বোঝে না। সে চেনে নদীর স্রোত, নৌকার বৈঠা আর চরের তপ্ত ধুলো। তার বাবা বর্ষাকালে নদীতে মাছ ধরেন আর শুকনা মৌসুমে অন্যের জমিতে জন খাটেন। সিয়ামের একটাই পুরনো খাতা, যার প্রতিটি পাতার মার্জিনে মার্জিনে সে পেন্সিল দিয়ে ছোট ছোট নৌকার ছবি এঁকে পুরো খাতা ভরিয়ে ফেলেছে। নতুন খাতা কেনার কথা বাবাকে বলতে তার ভয় করে।
কিন্তু আজকের রবিবার দুপুরটা চরে অন্যরকম এক অলৌকিক রোদের গন্ধ নিয়ে এল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ৮৮ ব্যাচের কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী চরের এই অখ্যাত, প্রায় ভোলা-ভালা স্কুলে হাজির হয়েছেন বড় বড় ব্যাগভরা উপহার নিয়ে।
অদ্ভূত ব্যাপার!
ব্যাগগুলো সাধারণ কোনো থলে নয়। একদম নতুন, চকচকে নীল রঙের উপহারের স্কুলব্যাগ। চরের বাচ্চারা এর আগে কখনো এত সুন্দর চেইন দেওয়া ব্যাগ দেখেনি। ব্যাগের ভেতরে আবার জ্যামিতি বোর্ড, বাঁধাই করা সাদা খাতা, কয়েক রঙের পেন্সিল, স্বচ্ছ প্লাস্টিকের স্কেল আর গন্ধওয়ালা রাবার।
দুই
উপহার হাতে পাওয়ার পর স্কুলের ছোট বারান্দায় একটা ছোটখাটো উৎসব লেগে গেল। যে চরে সাধারণত কান্না আর অভাবের শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যায় না, সেখানে আজ খুদে শিশুদের আনন্দের চিল চিৎকার।
ছোট্ট খাইরুন, যে মাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, সে তার নতুন রঙিন পেন্সিল আর স্কেলটা নাকের কাছে নিয়ে একটা লম্বা শুঁক শুঁকলো। নতুন খাতা আর কাঠের পেন্সিলের সুন্দর একটা গন্ধ থাকে। সেই গন্ধটা খাইরুনের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি জিনিস মনে হলো। পেন্সিল দিয়ে কাগজে কিছু একটা আঁকার আগে খাইরুন তার পাশের সহপাঠী সানজিদাকে ফিসফিস করে বলল, ‘দেখছিস সানজিদা? স্কেলটা দিয়া একদম সোজা দাগ দেওয়া যায়! বাঁকা হয় না। এখন থিকা আমি প্রতিদিন স্কুলে আসমু’
সানজিদা অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। যেন স্কেল দিয়ে সোজা দাগ দিতে পারাটাই এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর কাজ।
অন্যদিকে, পঞ্চম শ্রেণীর সিয়াম আর তার বান্ধবী মরিয়ম নতুন নীল রঙের ব্যাগ দুটো বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। তাদের ভয় হচ্ছে—হঠাৎ যদি কোনো অলৌকিক বাতাস এসে ব্যাগ দুটো উড়িয়ে নিয়ে যায়! কিংবা কেউ যদি তাদের কাছ থেকে ব্যাগটা কেড়ে নেয়!
স্কুল মাঠে তৈরি করা ছোট্ট মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন ঢাকা থেকে আসা অতিথি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু সাহেব। তিনি মাইক্রোফোনে বলছেন, ‘চরাঞ্চলের এই নিষ্পাপ শিশুরা হাজারো প্রতিকূলতা জয় করে প্রতিদিন স্কুলে আসে। ওদের করুণা নয়, ওদের শুধু সামান্য সুযোগ দরকার...’
সিয়াম বক্তৃতার দিকে পুরো খেয়াল দিচ্ছে না। সে চোরের মতো চারপাশে তাকিয়ে বারবার ব্যাগের চেইন খুলছে আর বন্ধ করছে। 'ঝিলিক ঝিলিক' করে চেইনের ধাতব শব্দটা তার কানে পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার সুরের মতো বাজছে। সিয়াম মরিয়মের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘মরিয়ম, কাল থেকে প্রতিদিন এই নীল ব্যাগে বই গুছিয়ে স্কুলে আসব। তুই আসবি তো রে?’
মরিয়ম পরম তৃপ্তিতে মাথা নেড়ে জানাল, সে অবশ্যই আসবে। এতো সুন্দর উপহারের ব্যাগে বই না ভরলে তো ব্যাগের ওপর ঘোর অন্যায় আর পাপ করা হবে!
তিন
বিকেলের সূর্যটা যখন চরের বালুকাবেলার ওপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হেলানো ছায়া তৈরি করছে, তখন সুধী সমাবেশ শেষ হলো। অতিথিরা তাদের ট্রলারের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। চরের বাতাসে কেমন যেন এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর স্নিগ্ধতা ভেসে বেড়াচ্ছে।
বক্তারা যাবার আগে বলে গেছেন—সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এই অবহেলিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কথাটা কতখানি খাঁটি সত্য, তা চরের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ওই খুদে শিশুদের দেখলেই হাড়ে হাড়ে বোঝা যায়।
একদল শিশু তাদের জীবনের প্রথম রঙিন নতুন ব্যাগ পিঠে চাপিয়ে আনন্দের সাথে বাড়ির দিকে হাঁটছে। চরের উড়ন্ত ধুলোবালি উড়ছে তাদের ছোট ছোট পায়ের ছন্দে।
সিয়াম কিছুদূর হেঁটে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। পিঠ থেকে নীল ব্যাগটা নামিয়ে চরের রোদে আবার একবার পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরল। নদী পার হয়ে আসা হিমেল ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগল তার ঘামে ভেজা মুখে। তার মনে হলো, চরের এই কঠিন ধুলোবালুতে হাঁটতে আজকে আর একটুও কষ্ট হচ্ছে না।
একটা নতুন ব্যাগ, কয়েকটা সাদা খাতা আর একটা পেন্সিল কীভাবে যে মানুষের ভেতরের শক্তি আর হাঁটার গতি এক লহমায় বাড়িয়ে দেয়, তা ঈশ্বর ছাড়া আর কে জানে!
চরাঞ্চলের এই ছোট ছোট ধূলোমলিন চোখগুলোতে আজ হাজারটা নতুন স্বপ্ন ডানা মেলছে। সামান্য সুযোগ আর ভালোবাসা পেলে চরের এই অবহেলিত শিশুরাও যে নদী ডিঙিয়ে নীল আকাশে দূর অজানায় উড়াল দিতে পারে—বিকালের রক্তিম ডুবন্ত সূর্য যেন আজ সেই কথাটিরই নীরব সাক্ষ্য দিয়ে গেল।
লেখক- শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)
বিভি/এআই













মন্তব্য করুন: