• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চরের নববধূর স্বপ্নভেজা অপেক্ষা

শফিকুল ইসলাম বেবু

প্রকাশিত: ১২:১৩, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১২:৩৩, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
চরের নববধূর স্বপ্নভেজা অপেক্ষা

শংকোষ নদীর পানি তখন ধীরে ধীরে বাড়ছে। নদীর বুকজুড়ে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে, আর বাতাসে কেমন একটা বৃষ্টির গন্ধ। গঙ্গাধার নদীর মাঝখানে ইসলামের চরটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বিশাল নদীর বুকের ওপর কেউ একমুঠো বালি ছিটিয়ে রেখেছে।

এই চরের মানুষগুলোর জীবনও বালির মতোই—আজ আছে, কাল নেই।

রুস্তম আলীর বয়স কেবল বিশ। কিন্তু তার কপালের ভাঁজ দেখে মনে হয় যেন চল্লিশ পার হয়ে গেছে। নদীভাঙন তাদের পরিবারকে এতবার উচ্ছেদ করেছে যে, এখন আর নতুন করে ঘর বাঁধতেও কারও আনন্দ লাগে না। তবু মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, প্রেমে পড়ে।

রুস্তমও পড়েছিল।

মহসিনের চরের আজিজুলের মেয়ে আকলিমাকে প্রথম দেখেছিল এক বর্ষার বিকেলে। মেয়েটা নদী থেকে কলসিতে পানি তুলে ফিরছিল। বাতাসে ওড়না উড়ছিল, কপালের চুল এলোমেলো হয়ে চোখে পড়ছিল বারবার। রুস্তম তখন বন্ধুদের সঙ্গে জাল টানছিল। সে মাছ ধরতে ভুলে গিয়েছিল, শুধু তাকিয়ে ছিল।

বন্ধুরা পরে অনেক খেপিয়েছিল তাকে।

—“ওই রুস্তম, মাছ ধরবি না প্রেম ধরবি?”

রুস্তম লজ্জায় শুধু হেসেছিল।

তারপর খুব দ্রুতই বিয়েটা হয়ে যায়।

বিয়ের পরের দিনগুলোতে রুস্তমের মনে হতো, পৃথিবীতে তার মতো সুখী মানুষ আর নেই। সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে আকলিমা কুপির আলোয় ভাত বেড়ে দিত। কখনও লাজুক গলায় বলত,

—“এই যে, এত চুপচাপ থাকেন ক্যান?”

রুস্তম মুচকি হেসে বলত,

—“তোমারে দেখলেই কথা হারাইয়া যায়।”

আকলিমা তখন মুখ নিচু করে হাসত। সেই হাসিতে চরাঞ্চলের অভাবও যেন কিছুক্ষণের জন্য হার মেনে যেত।

কিন্তু সুখ চরাঞ্চলে বেশিদিন থাকে না।

আষাঢ় মাস পড়তেই নদী ফুলে উঠল। আকাশে কালো মেঘ জমতে লাগল। চারদিকে বন্যার শঙ্কা। রুস্তমের ঘুম হারাম হয়ে গেল।

ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা। এক ভাই, দুই বোন। সংসারের সব দায় তার কাঁধে। ঢাকায় না গেলে চলবে না। রিকশা চালিয়ে টাকা পাঠাতে হবে। না হলে বন্যার সময় সবাই না খেয়ে থাকবে।

সেদিন রাতে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল রুস্তম। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ। ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে মাটিতে ছোট ছোট গর্ত তৈরি হচ্ছিল।

আকলিমা জিজ্ঞেস করল,

—“কী ভাবেন এত?”

রুস্তম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“ভাবি, যদি এই চরেই কাজ থাকত! তোমারে ছাইড়া যাইতে হইত না।”

আকলিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“মানুষ কি শখ কইরা দূরে যায়?”

কথাটা শুনে রুস্তমের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।

রাতের শেষে সে ব্যাগ গুছিয়ে রাখল। পুরোনো নীল ব্যাগ। ভেতরে দুইটা শার্ট, একটা গামছা আর মায়ের দেওয়া শুকনো মুড়ি।

ভোরে ফজরের আজান হলে সে বেরিয়ে পড়ল।

চারদিকে আষাঢ়ের কালো মেঘের ঘনঘটা। দূরে উথাল-পাথাল নদীর পানি ঘোলা হয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভেজা কাদা-পানির পথে হাঁটার সময় রুস্তমের পা ভিজে একাকার হচ্ছিল। পেছনে কাদাজলে ছপছপ পায়ের শব্দ শুনে সে ঘুরে তাকাল। আকলিমা।

সে চুপচাপ পেছনে হাঁটছে।

রুস্তম হেসে বলল,

—“এই ভোরে আবার কই যাও?”

আকলিমা মাথা নিচু করে বলল,

—“এমনি।”

দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। সরু বাঁশের সাঁকো পার হলো। কাশবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেল। বাতাসে সাদা কাশফুল দুলছিল। যেন প্রকৃতিও বিদায়ের আয়োজন করেছে।

হাঁটতে হাঁটতে রুস্তম হঠাৎ থেমে গেল।

তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বলে—“চলো, কোথাও যাই না। ঢাকা যামু না।”

কিন্তু সে জানে, গরিব মানুষের ভালোবাসার চেয়েও বড় বাস্তবতা হলো অভাব।

তাই সে শুধু বলল,

—“তুমি এখন বাড়ি যাও।”

আকলিমা দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে তখন নদীর মতো পানি।

রুস্তম আবার হাঁটা শুরু করল। কাঁধের ব্যাগটা দুলছিল। মাঝে মাঝে সে পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল।

দেখল, আকলিমা এখনও দাঁড়িয়ে।

কাশবনের পাশে, ভোরের আবছা আলোয়, একা।

রুস্তম ধীরে ধীরে বৃষ্টিভেজা কাদা-পানির আঁকাবাঁকা পথে দূরে হারিয়ে গেল, আর আকলিমা একা দাঁড়িয়ে রইল কাশবনের ধারে—ভোরের আবছা আলোয় প্রিয়জনের মিলিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে।

বাড়িমুখী একা পথে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, এই পথটা বুঝি কোনোদিন শেষ হবে না।

অনেকক্ষণ পরে সে বাড়ির দিকে ফিরতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই বলল,

—“নদী মানুষরে কত কিছু নেয়! ঘর নেয়, জমি নেয়… এখন মনে হয় সুখটাও নিয়াই যায়।”

দূরে তখন নদী গর্জে উঠছিল।

কাশবন দুলছিল বাতাসে।

আর চরজুড়ে নেমে আসছিল দীর্ঘ এক বিরহের সকাল।

 

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত