• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ | ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৮

BVNEWS24 || বিভিনিউজ২৪

অনলাইনে জুয়াঃ বছরে পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

প্রকাশিত: ২১:৫৫, ৭ নভেম্বর ২০২১

আপডেট: ১৫:৩৬, ৮ নভেম্বর ২০২১

ফন্ট সাইজ
অনলাইনে জুয়াঃ বছরে পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

দেশে অ্যাপস ও বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে চলছে অনলাইন জুয়া বা বাজি খেলা। দেশীয় আইনে নিষিদ্ধ এই জুয়া খেলা চলছে অনেকটা প্রকাশ্যেই। বিদেশ থেকে পরিচালিত এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপস শহর-নগর ছাড়িয়ে গ্রামেও চলছে দেদারছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে প্রকাশ্যে (স্বশরীরে) সংঘবদ্ধ জুয়া বা বাজি খেলার হার কমলেও অনলাইনে এই খেলার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

নিরবে-নিভৃতে সংঘবদ্ধ কাউকে ছাড়াই খেলতে পারা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকায় অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণরা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফুটবল, ক্রিকেট ও টেনিস খেলাসহ বিভিন্ন লীগ ম্যাচকে ঘিরে প্রতি মুহুর্তে বাজি ধরছে তরুণরা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা ভাগিয়ে নিচ্ছে কয়েকটি চক্র।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি বলছে, দেশে পরিচালিত জুয়ার সাইটগুলোর পরিচালনাকারীরা বিদেশে অবস্থান করছে। তারা প্রথমে দেশের গুরুত্বর্পূণ এলাকাগুলোকে টার্গেট করে একেকটি চক্র গড়ে তোলে। এরপর ওই চক্র বিপদগামী তরুণেদের ভার্চ্যুয়ালি জুয়া খেলায় অল্প টাকা বিনিয়োগে বেশি টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে। এইভাবেই প্রতিদিন অনলাইন জুয়া খেলায় দেড় থেকে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে। যার পরিমান বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। হুন্ডির মাধ্যমে এসব টাকা পাচার হচ্ছে দেশের বাহিরে থাকা চক্রের মূল হোতাদের কাছে। সম্প্রতি অনলাইন জুয়া নিয়ে অনুসন্ধানে কোটি কোটি টাকা পাচার করা কয়েকটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। শীঘ্রই তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে সংস্থাটি।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, সঠিক নজরদারি না থাকায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিদিনই কোটি টাকা পাচার হচ্ছে দেশের বাহিরে। এতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি তরুণ ও যুবকদের বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।  এই জন্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অবহেলাকেই দুষছেন বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনলাইনে জুয়া খেলা পরিচালনার জন্য- বেট ৩৬৫ ডটকম, প্লেবেট ৩৬৫ ডটকম, বিডিটি ১০ ডটকম, উইনস ৬৫ ডটকম ও বেটস্কোর ২৪ ডটকমসহ অন্তত এরকম অর্ধশতাধিক বেটিং সাইট চালু রয়েছে দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। এসব অনলাইন জুয়ার সাইট মাঝে মাঝে তথ্য পেয়ে বিটিআরসি থেকে বন্ধ করা হয়। কিন্তু এর ব্যহারকারীরা বলছেন, বন্ধ করলেও ভিপিএন-এর সাহায্যেই এসব সাইট খোলা যায়। স্থায়ীভাবে সাইটগুলো বন্ধ না হওয়ায় জুয়া খেলায় তেমন প্রভাব পড়ে না খেলোয়ারদের।

আরও পড়ুন: বাড়ছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি, বিপথে কিশোর-তরুণরা

তথ্যমতে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর ডেমরার গলাকাটা এলাকা থেকে দেলোয়ার হোসেন (৪৫), মহিউদ্দিন (৩৩) ও জামাল মিয়া (২৫) নামে তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) রমনা বিভাগ।  তারা বিদেশ থেকে পরিচালিত বেটিং সাইটে অংশ নিয়ে জুয়া খেলতো। তাদেরকে গ্রেফতারের পর ডিবি জানতে পারে, তারা নিজেরা শুধু জুয়া খেলে ঠিক তা নয়, তারা জুয়া খেলার পাশাপাশি একটি চক্রের দেশীয় এজেন্ট হিসেবেও কাজ করতো। তাদের মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হতো কোটি টাকা।  

ডিবি রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, প্রথমে তারা ইমেইলের মাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খোলে। এরপর সেই অ্যাকাউন্টে দেশিয় টাকাকে ডলারে রুপান্তর করা হয়। তবে এই ডলার সহজভাবে কোনো সাধারণ খেলোয়াড় করতে পারে না। এই জন্য রয়েছে চক্র। তারা এজেন্ট হিসেবে কাজ করে দেশীয় টাকা নিয়ে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের দিয়ে অ্যাকাউন্টে ডলার রুপান্তর করার কাজটি করে এবং দেশীয় টাকাটা হুন্ডির কাজে লাগায়।

একই কথা বললেন সিআইডি’র একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মর্যাদার কর্মকতাও। তিনি বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, দেশে বসে অনলাইন জুয়া খেলায় সহযোগিতা করছেন এমন ছয় জন এজেন্টকে গত ১৬ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি’র সাইবার টিম। গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে অনলাইন জুয়া খেলায় খেলোয়াড়দের টাকা সংগ্রহ করে বিদেশে থাকা মূল হোতাদের কাছে পাচার করতো।

তিনি আরও বলেন, রাশিয়ায় থেকে তিন ব্যক্তি অনলাইন সাইট পরিচালনা করছে। ওই ব্যক্তিদেরকে ওই চক্রের সদস্যরা দেশীয় খেলোয়াড়দের থেকে ডলারের বিনিময়ে আদায় করা দেশীয় টাকা সংগ্রহ করে তা পাচার করতো। তদন্তে ওই চক্রের পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রত্যেকটিতে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা পাচার করার তথ্য মিলেছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই বিষয়ে সিআইডি’র সাইবার ক্রাইম শাখার অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি)  কামরুল আহসান বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, সম্প্রীতি অনলাইন জুয়া খেলার নিয়ন্ত্রণকারীদের দেশীয় একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছি আমরা। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাছাই বাছাই করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ওই চক্রটির সংগে কারা কারা জড়িত সেসবের তথ্যও আমরা পেয়েছি। জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি।

অনলাইন জুয়ায় প্রতিদিন কি পরিমান টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি  কামরুল আহসান বলেন, ধারণা করছি প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে। যার বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তথ্য প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা’র মতে, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর উদাসীনতার ফলে ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। এতে একদিকে অর্থপাচারের কারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম বিপথে যাচ্ছে জানিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

তানভীর হাসান জোহা বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, কোথাও সংঘবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে এখন আর কাউকে জুয়া খেলতে হয় না। বদ্ধ রুমে বসে যে কেউ কৌতূহলবসত জুয়ার সাইটগুলোতে ক্লিক করেই আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে। এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে কিশোর ও তরুণ বয়সীদের। যদিও সব বয়সীরাই এই জুয়া  খেলার আসক্তিতে পড়তে পারে। কারণ সোস্যাল মিডিয়াতে এসব জুয়ার সাইটগুলোর বিষয়ে এমনভাবে প্রমোশন পোস্ট হয়, যে কেউ প্রলোভনে পড়বেই।

তিনি বলেন, দেশে বসে যারা জুয়া খেলে তাদের অধিকাংশই জানেন না তাদরে টাকাটা কিভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

 তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, লন্ডনে বসে কেউ একজন জুয়ার সাইট পরিচালনা করছে। সে তার এই সাইট পরিচালনার জন্য দেশে কয়েকজন এজেন্টকে কমিশনের বিনিময়ে কাজ দিলো। ওই এজেন্টরা জুয়া খেলোয়াড়দের কাছে নগদ টাকা গ্রহন করে লন্ডনে থাকা ব্যক্তিকে দিয়ে ডলার সাবমিট করছে। এবার যখন জুয়াড়ি পাঁচ ডলারের বিনিময়ে বাজি ধরলো এবং সে বাজিতে জিতে ২০ ডলার পেলো। তখনও কিন্তু ওই এজেন্টরা ওই জুয়াড়িকে ডলারের বিনিময়ে নগদ টাকা সরবরাহ করছে। অন্যদিকে যেই দেশের ডলার সেই দেশে থেকে যাচ্ছে। এতে দেশে রেমিট্যান্সের উপর প্রভাব পড়ে।

তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া ছাড়াও আরও একটি প্রক্রিয়া হলো- দেশীয় এজেন্টরা জুয়াড়িদের কাছ থেকে আদায় করা নগদ টাকাকে হুন্ডির মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে। যা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই যে প্রক্রিয়াগুলো ঘটছে, চাইলে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিন্তু তাদের উদাসীনতার কারণে এসব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।

বিভি/এএন

মন্তব্য করুন: