দেড় বছরে স্বর্ণের ভরিতে বেড়েছে দেড় লাখ টাকা, নেপথ্যে কী?
আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়ানোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। দেশে স্বর্ণের বাজারে একের পর এক রেকর্ড দামে সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে—স্বর্ণের ভরি কি খুব শিগগিরই ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে?
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ঘোষিত সর্বশেষ দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট বা ভালো মানের স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক বাজারে রেকর্ড
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয় ডলারপ্রতি আউন্স হিসাবে। ২৮ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। এক আউন্সে ৩১.১০৩৫ গ্রাম স্বর্ণ থাকায়, এই হিসাবে প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৬৯ ডলার।
বাংলাদেশের বাজারে এক ভরি স্বর্ণ ধরা হয় ১১.৬৬৪ গ্রাম। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী প্রতি ভরি স্বর্ণের কাঁচামালের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১,৯৭২ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) শুধু কাঁচামাল হিসাবেই ভরিপ্রতি দাম পড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমদানি ব্যয়, ঝুঁকি প্রিমিয়াম, ভ্যাট, সরকারি কর, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মজুত খরচ। সব মিলিয়ে বাজুস নতুন করে দাম নির্ধারণ করে ভরিপ্রতি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ টাকা ঘোষণা করেছে।
দেড় বছরে ভরিতে বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। দেড় বছরের ব্যবধানে দাম বেড়ে এখন ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে—অর্থাৎ ভরিপ্রতি বৃদ্ধি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে আন্তর্জাতিক বাজারের লাগাতার ঊর্ধ্বগতি, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে।
কেন নিয়ন্ত্রণহীন স্বর্ণের বাজার?
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি প্রধান কারণে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী—
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বড় শক্তিগুলোর টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সুদের হার ও ডলারের দুর্বলতা: যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার সম্ভাবনা এবং ডলার দুর্বল হওয়ায় স্বর্ণ বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক ক্রয়: চীনসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা কয়েক মাস ধরে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে, ফলে বৈশ্বিক চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ।
এ ছাড়া স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) রেকর্ড বিনিয়োগ প্রবাহ দাম আরও বাড়াচ্ছে।
ভরি কি ৩ লাখ ছাড়াবে?
এ বিষয়ে বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান ড. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে স্বর্ণের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কমে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম:
২২ ক্যারেট স্বর্ণ: ভরি ২,৬৯,৭৮৪ টাকা
২১ ক্যারেট: ভরি ২,৫৭,৪৮৩ টাকা
১৮ ক্যারেট: ভরি ২,২০,৭৪৩ টাকা
সনাতন পদ্ধতি: ভরি ১,৮১,৭১১ টাকা
নতুন দাম (২৮ জানুয়ারি থেকে কার্যকর) বুধবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
রুপার দামও বেড়েছে—
২২ ক্যারেট রুপা: ভরি ৭,৭৫৭ টাকা
২১ ক্যারেট: ভরি ৭,৪০৭ টাকা
১৮ ক্যারেট: ভরি ৬,৩৫৭ টাকা
সামনে কী হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলারের ওপরে স্থিতিশীল থাকে বা আরও বাড়ে, তাহলে দেশের বাজারে ভরি ৩ লাখ টাকা ছাড়ানোর চাপ আরও জোরালো হবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে, ডলার শক্তিশালী হলে বা সুদের হার দীর্ঘদিন উচ্চ থাকলে স্বর্ণের দামে সাময়িক সংশোধনও আসতে পারে।
বিভি/টিটি



মন্তব্য করুন: