প্রতিষ্ঠার দেড় যুগ পার হলেও বুটেক্সে প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদ ফাঁকা
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) দেশের একমাত্র পাবলিক টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পার হলেও প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের মতো প্রশাসনিক দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়াই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পাশাপাশি প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের দায়িত্বও পালন করে আসছে।
দীর্ঘসময় ধরে বুটেক্সের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো মূলত উপাচার্যকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এতে একদিকে উপাচার্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে আর্থিক অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়ন ও ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ১২(৫) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর সংবিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত এবং ভাইস-চ্যান্সেলর কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালন করিবেন।’ এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন প্রো-ভিসি।
এই আইনে ১৩(৫) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোষাধ্যক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের সার্বিক তত্ত্বাবধান করিবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসংক্রান্ত নীতি সম্পর্কে ভাইস-চ্যান্সেলর, সংশ্লিষ্ট কমিটি, ইনস্টিটিউট ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পরামর্শ প্রদান করিবেন।’ আইনের ১৩(৩) ধারা অনুযায়ী, ট্রেজারার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির সভাপতিও থাকবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ও আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপন রেখে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ভর্তি ফি কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হয়, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয় না। একইভাবে, প্রথমবর্ষে ভর্তি সময় দেওয়া রশিদেও বিভিন্ন খাতের নাম থাকলেও খাতভিত্তিক টাকার পরিমাণ উল্লেখ থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সংক্রান্ত তথ্যও রাখা হচ্ছে সম্পূর্ণ গোপনীয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি বিভাগীয় প্রধান ও ফ্যাকাল্টি ডিনরাও বাজেটের বিস্তারিত জানেন না বলে জানা গেছে। বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে ফাইন্যান্স বিভাগ উপাচার্যের নিষেধাজ্ঞার কথা জানায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, অধ্যাপক মো. আবুল কাশেম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বকালীন ট্রেজারার পদ নিয়োগে বুটেক্সের তিনজন শিক্ষকের নাম সুপারিশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর প্রস্তাব পাঠায়। সেসময় প্রশাসনের বা ট্রেজারার প্রার্থীদের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় পদটিতে নিয়োগ হয়নি। প্রায় দেড় বছর পর অধ্যাপক ড. শাহ আলিমুজ্জামান উপাচার্যের দায়িত্বে এসে সুপারিশকৃত শিক্ষকদের মধ্যে একজনের নাম পরিবর্তন করে এবং একই ধারাবাহিকতায় তিনজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আরেকটি প্রস্তাব পাঠায়। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ও উপাচার্যের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে মতবিরোধ থাকায় ট্রেজারার নিয়োগের প্রক্রিয়া বেশিদূর আগায়নি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দিকে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী প্রস্তাবিত তিনজনের নাম বাদ দিয়ে আওয়ামী মতাদর্শের চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠায়। কিন্তু সেসময় জুলাই অভ্যুত্থানে সরকার পতনের কারণে নিয়োগের কাজটি স্থগিত হয়ে যায়।
এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. রাশেদা বেগম দিনা বলেন, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার সরকার থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুইটি পদ নিয়োগে নিয়ম থাকলে অনেক আগেই হয়ে যেতো। এখন যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে, এই দুইটি পদে নিয়োগ সময় লাগবে। আমাদের খালি থাকা সব পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের প্রশাসনিক কাজ সামলাতে আরো লোক-জনবল প্রয়োজন। নিয়োগ হলে প্রশাসনিক কাজের গতি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক দিক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপকৃত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের বিষয়টা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে নিয়োগ দিবে। এই পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব পলিসি আছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলে নিয়োগের সুযোগ কম থাকে। পদ দুইটিতে নিয়োগ হয়নি এমন অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ট্রেজারারের কাজ করে আমি কোনো টাকা পাই না। ট্রেজারারের কাজ হিসেবে আমাকে শুধু স্বাক্ষর করতে হয়, বাকি সকল কাজ অর্থ ও হিসাব দপ্তর করে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে এবং এই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। বুটেক্স প্রশাসন চাইলে আমাদের প্রস্তাব পাঠাতে পারে। এতে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আমরাও হয়ত ব্যবস্থা নিতে পারি।
উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান ভিসি তার অনুগত তিনজন শিক্ষকের নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন বিভিন্ন মহল থেকে এমনটা শোনা গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: