কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর উদ্যোগে ১০ টাকায় ইফতারি প্যাকেজ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ১০ টাকায় ইফতারি প্যাকেজ দিচ্ছেন। রমজানে নিত্য-পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাজার যখন অস্থির, ঠিক সেই সময় টিউশনির টাকা ও কিছু শিক্ষকদের অনুদানে ৬০–৭০ টাকার ইফতারি প্যাকেজ মাত্র ১০ টাকায় বিতরণ করছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ।
গাইবান্ধার ছেলে কাজী মিরাজ ছোটবেলা থেকেই সেবামূলক কাজে আগ্রহী। মানুষের উপকার করতে পারলে তিনি আলাদা এক তৃপ্তি পান। সেই ভাবনা থেকেই রমজানকে কেন্দ্র করে তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। শুরুতে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন, বিনামূল্যে ইফতার দিলে অনেকেই সংকোচ বোধ করতে পারেন। তাই স্বল্পমূল্যে ইফতার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন, যাতে নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীরা সম্মান বজায় রেখে ইফতার নিতে পারেন।
স্থানীয় হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করে বন্ধুদের সহযোগিতায় ইফতার প্যাকেট প্রস্তুত ও বিতরণ করেন তিনি। বেশিরভাগ দিনই দেয়া হয় বিরিয়ানি; সঙ্গে থাকে দুটি পাকোড়া ও একটি খেজুর। বিরিয়ানির পরিবর্তে কোনো কোনো দিন ইফতার প্যাকেট বিতরণ করা হয়। প্রতিটি প্যাকেটে থাকে খেজুর, মুড়ি, ছোলা, কলা, জিলাপি, বড়া, আলুর চপসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ ধরনের আইটেম।
শুরুর দিকে ৮০ থেকে ১০০টি প্যাকেট প্রস্তুত করা হলেও চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক শিক্ষার্থী খাবার না পেয়ে ফিরে গেলে বিষয়টি তাকে নাড়া দেয়। ফলে প্যাকেটের সংখ্যা বাড়াতে হয়। তবে এতে ব্যয়ও বেড়ে যায়। আর্থিক সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও থেমে যাননি মিরাজ।
নিজের উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে কাজী মিরাজ বলেন, গত দুই বছরের রমজানের মতো এবারও ক্যাম্পাসে ১০ টাকায় ইফতার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ও আশপাশে এমন মানুষ আছেন, যারা আর্থিক কারণে ভালোভাবে ইফতার করতে পারেন না। তারা দোকান থেকে ১০–২০ টাকার ইফতার কিনতেও লজ্জাবোধ করেন। তাই সবাই যাতে মাত্র ১০ টাকায় পূর্ণাঙ্গ ইফতার পান, সে জন্যই আমার এই উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, ইনশাআল্লাহ ক্যাম্পাস যতদিন খোলা থাকবে, আমি এই কার্যক্রম চালিয়ে যাব। এই উদ্যোগে ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক অনুদান দিয়েছেন। আমার নিজ বিভাগের স্যার-ম্যামসহ অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন। ফলে গত বছর আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর হাতে ইফতার পৌঁছে দিতে পেরেছি। এবারও অনেকে সহযোগিতা করেছেন এবং করবেন। আশা করি এবারও পারব।
বিকাল ৫টায় আসরের নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে এই ইফতার বিক্রি করা হয়। ইফতার নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আনসার সদস্য, আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ইফতার সংগ্রহ করেন।
ইফতার নিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, মিরাজ ভাইয়ের এই ১০ টাকার ইফতার সত্যিই অসাধারণ একটি উদ্যোগ। আমরা এখানে মাত্র ১০ টাকায় একটি পরিপূর্ণ ইফতার প্যাকেজ পাচ্ছি, যা আমাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাধারণত যে টাকা দিয়ে ইফতার কিনতাম, সেই টাকা আমরা রাতে বা সেহরিতে খাবারের জন্য ব্যয় করতে পারি। এতে আমাদের অনেক উপকার হয়। এমন উদ্যোগ নেয়ার জন্য ভাইকে ধন্যবাদ।
গত দুই রমজান ও এবারে শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক সাড়া তার উদ্যোগকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কার্যক্রম চালুর স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার বিশ্বাস, শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে প্রতিটি ক্যাম্পাসেই স্বল্পমূল্যের ইফতারি কার্যক্রম গড়ে তোলা সম্ভব। সম্মিলিত উদ্যোগেই উপকৃত হবে অসংখ্য নিম্নমধ্যবিত্ত।
বিভি/টিটি



মন্তব্য করুন: