ঢাবিতে ইউএস কনস্টিটিউশন ডে উদযাপন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে ‘ইউএস কনস্টিটিউশন ডে’ উদযাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ এবং মৌলিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আধুনিক সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মতো নীতিগুলো এই সংবিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এসব নীতি বিশ্বব্যাপী সাংবিধানিক চিন্তা ও চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশেরও রয়েছে দীর্ঘ সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রাম ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে এই সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। তাই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সংলাপ ও তুলনামূলক আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম আরও বলেন, সংবিধান কেবল একটি বিমূর্ত একাডেমিক বিষয় নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক ধারণাগুলো সরাসরি অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মাধ্যমে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও অর্থবহ আলোচনা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সূচনা হয়েছে ‘We the People’—এই সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য দিয়ে। ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর কনস্টিটিউশন ডে পালিত হয়। এ দিনটি দেশটির সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার একটি সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রেখেছে। সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো শুধু কোনো একটি দেশের জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় আগ্রহী সব সমাজের জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সাংবিধানিক চর্চার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বিভিন্ন সাংবিধানিক নীতি ও ধারণা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে বিচারিক পর্যালোচনা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো সাংবিধানিক অধ্যয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ ধরনের আলোচনা শিক্ষার্থী, আইনজীবী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সাংবিধানিক ধারণা আরও গভীরভাবে অনুধাবনে সহায়তা করবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধান ও সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের একাডেমিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আইন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক চর্চা নিয়ে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে ‘ইউএস কনস্টিটিউশন’ বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং দুই দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার তুলনামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার অঙ্গনের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: