‘মাঠের নায়ক কোহিনুর এর ফুটবল জীবন’
কুড়িগ্রাম শহরের মোল্লাপাড়া। সালটা ১৯৫৯, দিনটি ছিল ১১ মার্চ। আব্দুল খালেক মোল্লা ও শামসুন নাহার দম্পতির ১৪ সন্তানের অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া এক শিশুটি সেদিন হয়তো কেঁদেছিল নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে। কিন্তু কে জানত, পরিবারের সেই আদরের কোহিনুর রহমান একদিন কেবল কুড়িগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠবেন? ছোটবেলায় কোহিনুর ছিলেন ভীষণ ডানপিঠে। পড়াশোনার প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগী না হলেও কোনো দিন ক্লাসে অকৃতকার্যের খাতায় তার নাম ওঠেনি। তবে তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিলো খেলাধুলা। বিশেষ করে অ্যাথলেটিক্স ও ফুটবলের প্রতি তাঁর রক্তে মিশে ছিল এক তীব্র নেশা।
১৯৭২ সালে কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করে তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম কলেজে। ঠিক তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে আমার বয়স তখন খুব কম, নিজে ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মনে আজও গেঁথে আছে সেদিনের স্মৃতি। কুড়িগ্রাম কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তখন অ্যাথলেটদের মধ্যে চলত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। মাঠে শুরু হলো প্রতিযোগিতা। পাঁচ ইভেন্টে বুক চিতিয়ে লড়লেন কোহিনুর। কিন্তু সে সময়ের অপ্রতিরোধ্য ও সেরা অ্যাথলেট সিরাজুল ইসলাম টুকু ভাইয়ের সাথে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে সামান্য ব্যবধানে হোঁচট খেয়ে তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল দ্বিতীয় স্থানে। তবে অন্যান্য ইভেন্টে তার মুনশিয়ানা ছিল চোখে পড়ার মতো। মূলত সেই কলেজ মাঠের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকেই কোহিনুর ভাইকে চেনা ও জানার শুরু। তখন কি আর কেউ ভেবেছিল, এই কিশোরের পায়েই একদিন কাঁপবে ঢাকার সবুজ গালিচা?
জীবনের প্রতিটি বাঁকে থাকে নাটকীয়তা। গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়ামে বসে যখন তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ এলো, তিনি শোনালেন তার ঢাকা যাওয়ার পেছনের সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস। সালটা ১৯৭৪। কুড়িগ্রাম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষার রসায়ন ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ করে বন্ধু দেবু দাদাকে নিয়ে বিকেলে ফিরছিলেন কোহিনুর। দেবু দাদা ছিলেন বেশ ধার্মিক মানুষ। কোনো এক পূজাপার্বণে পূজায় বিতরণের জন্য সরকার বা পৌরসভার মাধ্যমে দুধ দেওয়ার কথা ছিল। সেই দুধ পাওয়ার আশায় দেবু দাদা তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ মনসুর আলী টুংকুর ঘোষপাড়ার বাসভবনে যান; সঙ্গে ছিলেন কোহিনুর রহমান। কিন্তু পূজার দুধ সরবরাহ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে বচসা চরম আকার ধারণ করে।
ঐ অনভিপ্রেত ঘটনার পর পুলিশি ভয়ে দেবু দাদা নাটোরে তার নানা বাড়িতে পালিয়ে যান, আর কোহিনুর ভাই সোজা চলে যান তার বড় বোন ছালমা বেগমের (নিরু) ঢাকার ওয়ারীর বাসায়। ঢাকায় এসে এইচএসসি পাস করার পর তিনি জগন্নাথ কলেজে বিএ পাস কোর্সে ভর্তি হন এবং ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর শুরু হয় তাঁর জীবনের আসল লড়াই। ১৯৭৫ সালের এক বিকেল। ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গেছেন কোহিনুর। হঠাৎ দেখলেন, তখনকার ‘সাধারণ বীমা’ ফুটবল টিমের জন্য খেলোয়াড় বাছাই চলছে। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে কোহিনুর ভাই নির্ভয়ে কোচকে গিয়ে বলে বসলেন, ‘আমি খেলতে চাই।’ কোচ বললেন, ‘আগামীকাল আসো।’ পরের দিন মাঠে নেমে মাত্র পাঁচ মিনিট খেলায় নিজের মেধার পরিচয় দিলেন তিনি। কোচ বুঝতে পারলেন, এই তরুণ সাধারণ কেউ নন। তৎক্ষণাৎ তিনি উত্তীর্ণ হলেন।
তখন ‘সাধারণ বীমা’ ক্লাবটি খেলত দ্বিতীয় বিভাগে। সেখান থেকেই শুরু হলো কোহিনুর রহমানের ঢাকার মাঠের অবিশ্বাস্য অভিষেক। অভিষিক্ত হয়েই সেই বছর সাধারণ বীমাকে রানার্স-আপ করতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। তাঁর সেই চোখ জুড়ানো পারফরম্যান্স দেখে দেশের নামিদামী ক্লাবগুলো তাকে নেওয়ার জন্য দলে টানতে চেয়েছিলো। কিন্তু কোহিনুর ভাই বড় দলে ভিড়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকার ভুল করেননি। তিনি জানতেন, বড় দলে গেলে সুযোগের অপেক্ষা করতে করতে অনেক সময় প্রতিভা হারিয়ে যায়। তাই তিনি যোগ দিলেন শান্তিনগর ক্লাবে এবং ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হলেন।
শান্তিনগর ক্লাবে টানা দুই বছর (১৯৭৬-৭৭) খেলার পর ১৯৭৮ সালে তিনি যোগ দেন ওয়াপদা ক্লাবে। আর ১৯৭৯ সালে নাম লেখান ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। মোহামেডানে টানা ৬ বছর অত্যন্ত দাপটের সাথে খেলেছেন তিনি। জাতীয় দলের এই তারকা ফুটবলার বাংলাদেশ ও মোহামেডান দলের হয়ে মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বহু দেশ সফর করেছেন এবং লাল-সবুজ পতাকার গৌরব সমুন্নত রেখেছেন।
আমাদের আলাপচারিতায় তিনি গভীর নস্টালজিয়া নিয়ে স্মরণ করলেন ফুটবলের সেই স্বর্ণযুগকে। আবাহনীর সালাউদ্দিন, চুন্নু, কাজী আনোয়ার, ইউসুফ এবং মোহামেডানের মেজর হাফিজ (বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার), এনায়েত, শান্টু, মোসাব্বের, সালাম, বাদল রায় ও গাফফারের মতো কিংবদন্তি ফুটবলারদের অবদান তিনি সকৃতজ্ঞে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন কোহিনুর রহমান। আমেরিকা ও বাংলাদেশ—দুই দেশের মাঝেই এখন তার যাতায়াত। তবে মাটির টান তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে এই বাংলায়। তার আজীবনের একটিই বড় প্রত্যাশা—ঢাকা ছাড়িয়ে ফুটবলের সেই পুরনো উন্মাদনা আবার ছড়িয়ে পড়ুক বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও গ্রামের মাঠে মাঠে। কুড়িগ্রামের মোল্লাপাড়ার সেই দুরন্ত কিশোর আজ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসেও আমাদের জাতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে আছেন।
লেখক- শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক













মন্তব্য করুন: