বাবা-মা ছাড়া নানির হাত ধরে বারাক ওবামার অবিশ্বাস্য যাত্রা!
২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছিলেন বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ প্রেসিডেন্ট হবেন, তখন এটা ছিল কল্পনার বাইরে। ওই বছরের ৪ নভেম্বর সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন বারাক ওবামা। দুই বছর বয়সে বিচ্ছেদ হয়েছিল মা–বাবার। কিন্তু থেমে যাননি ওবামা। নানির কাছে বড় হয়ে বদলে দিলেন গোটা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ধারা।
বারাক ওবামা যখন স্বপ্ন পূরণের দারপ্রান্তে তখনই তাকে কোলে-পিঠে করে বড় করা নানি ম্যাডেলিন ডানহ্যাম মারা যান ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর। নানির মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন বারাক ওবামা। দাসপ্রথার অবসানের দেড় শতাব্দী পর দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে বদলে দেন আমেরিকার ইতিহাসের এক অধ্যায়। তবে এই অর্জনের পেছনে ছিল বর্ণবৈষম্য, পারিবারিক বিচ্ছেদ আর নানা বাধা পেরিয়ে উঠে আসার দীর্ঘ সংগ্রাম।
১৯৬১ সালের ৪ আগস্ট হাওয়াইয়ের হনলুলুতে জন্ম ওবামার। বাবা কেনিয়ার নাগরিক, মা শ্বেতাঙ্গ মার্কিন। মাত্র দুই বছর বয়সেই মা-বাবার বিচ্ছেদ। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর শৈশবের কয়েক বছর কাটে ইন্দোনেশিয়ায়। পরে হাওয়াইয়ে ফিরে নানা-নানির কাছে বেড়ে ওঠেন। পড়াশোনা শেষে শিকাগোয় নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন। হার্ভার্ড ল রিভিউয়ের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সভাপতি হয়েও আলোচনায় আসেন তিনি।
১৯৯৬ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটর নির্বাচিত হলেও ২০০০ সালে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে হেরে যান। কিন্তু থেমে থাকেননি। ২০০৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। চার বছর পর দলীয় মনোনয়ন পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আর্থিক সংকট, ইরাক যুদ্ধ ও বুশ প্রশাসনের প্রতি মানুষের অসন্তোষের মধ্যে ‘চেঞ্জ উই ক্যান বিলিভ ইন’ স্লোগানে ওবামা আশার বার্তা দেন ভোটারদের।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জন ম্যাককেইনকে হারিয়ে ৩৬৫টি ইলেকটোরাল ভোট পান ওবামা। ২০০৯ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। দ্বিতীয় মেয়াদেও নির্বাচিত হন তিনি। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্যবিমা সম্প্রসারণ ও কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন তার উল্লেখযোগ্য অর্জন। ২০০৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পান।
তবে তার শাসনামল বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় ড্রোন হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, অভিবাসী বহিষ্কার এবং গুয়ানতানামো কারাগার বন্ধ করতে না পারা নিয়ে সমালোচনা ছিল। লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপকে নিজের প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ভুল বলেও স্বীকার করেন তিনি।
২০১৭ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর বই লেখা, চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও ফাউন্ডেশনের কাজে যুক্ত হন ওবামা। তবে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে থাকেননি। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে আবারও প্রচারমঞ্চে সক্রিয় তিনি।
যে মানুষটি একসময় বর্ণবৈষম্যের বাধা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছেছিলেন, সেই বারাক ওবামার রাজনৈতিক পথচলা এখনও আমেরিকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: