নীরবে বাসা বাঁধা যে ৫ রোগ কেড়ে নিতে পারে প্রাণ
শরীরে নীরবে বাসা বাঁধে অনেক রোগ। শুরুতে তেমন কোনো উপসর্গ না থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না, তার শরীরে বিপজ্জনক কোনো রোগের বিকাশ ঘটছে। একপর্যায়ে লক্ষণ প্রকাশ পেলে দেখা যায়, রোগটি ইতিমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এসব রোগের কিছু প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের মতো ব্যাধি দীর্ঘদিন উপসর্গহীন থাকতে পারে। তাই সুস্থ বোধ করলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জেনে নেওয়া যাক, নীরবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে এমন পাঁচটি রোগ সম্পর্কে।
১. উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ, অনেকের রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছালেও কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ না থাকলেও উচ্চ রক্তচাপ থাকতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
২. উচ্চ কোলেস্টেরল
রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলেও সাধারণত কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায় না। দীর্ঘদিন কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও বংশগত কারণ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এর মাত্রা নির্ণয় করা যায়। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত।
৩. ডায়াবেটিস
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস হয়। শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে অথবা ইনসুলিন কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারলে এ রোগ দেখা দেয়।
বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি কিংবা অকারণে ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তবে এসব লক্ষণ না থাকলেও ডায়াবেটিস হতে পারে।
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চোখ, কিডনি, স্নায়ু ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
৪. ফ্যাটি লিভার
লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ফ্যাটি লিভার হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগের তেমন কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে অনেকেই রোগটি সম্পর্কে জানতে পারেন না।
অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে লিভারে চর্বি জমার পাশাপাশি প্রদাহ ও ক্ষতি বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে তা ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসে রূপ নিতে পারে। গুরুতর লিভার রোগের ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ঝুঁকি কমাতে ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে লিভারের কার্যকারিতা ও অন্যান্য পরীক্ষা করানো উচিত।
৫. দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগও নীরবে অগ্রসর হতে পারে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকলেও তা সহজে বোঝা যায় না।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। রোগটি বাড়তে থাকলে শরীরে পানি জমা, পা ফুলে যাওয়া, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা কিংবা প্রস্রাবের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। গুরুতর পর্যায়ে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিডনি সুস্থ রাখতে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের ক্রিয়েটিনিন, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
সুস্থ থাকতে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
নীরব ঘাতক রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
পাশাপাশি সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: