• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

আয়কর রিটার্ন জমা না দিলেই কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা?

প্রকাশিত: ১৯:৩২, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
আয়কর রিটার্ন জমা না দিলেই কি ৫ হাজার টাকা জরিমানা?

ই-টিন নিবন্ধন থাকার পরও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার আগের আয় নিরূপণ হয়েছে কি না এবং তার ক্ষেত্রে আইনের কোন বিধান প্রযোজ্য, তার ওপর।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অনেক করদাতার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা। এটি সবার জন্য নির্ধারিত স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়।

রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া আইনে উল্লেখিত ধারার অধীনে রিটার্ন জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

আইনের বিধান অনুযায়ী, সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করা করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা সবার জন্য এক নয়।

আগে আয় নিরূপণ হয়নি: ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।

আগে আয় নিরূপণ হয়েছে: সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেটি সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা হিসেবে বিবেচিত হবে।

অর্থাৎ, জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার পরিস্থিতি ও আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করা হয়।

ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?
আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হয় আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই সবাই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত—এমন নয়।

সাধারণত যাদের আয় নির্ধারিত করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে, ফার্মের অংশীদার, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী এবং আইনে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির ব্যক্তির রিটার্ন দাখিল করতে হয়। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাদের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে হয়, তাদের ক্ষেত্রেও এ বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হতে পারে।

তাই শুধু ই-টিন আছে কি না কিংবা আয় করযোগ্য কি না, তা দেখেই রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

আয়কর রিটার্ন জমার শেষ তারিখ কখন?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। তবে নির্দিষ্ট করবর্ষে এনবিআর সময়সীমা বাড়ালে বর্ধিত সময়সীমা কার্যকর হয়।

২০২৫-২৬ করবর্ষে রিটার্ন জমার সময়সীমা কয়েক দফায় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানার বিষয়টি যাচাই করতে হবে।

আয় করযোগ্য নয়, কিন্তু ই-টিন আছে—করণীয় কী?
অনেকে ব্যাংকিং কার্যক্রম, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরে তাদের আয় কমে যেতে পারে বা করযোগ্য আয় না-ও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে গেলেই রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। তবে টিআইএন বাতিলের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের যাচাই ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। টিআইএন বাতিল এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়।

যেভাবে নিজের রিটার্নের অবস্থা যাচাই করবেন
ই-টিন নেওয়ার পর কোনো করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন: এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টালে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

২. রিটার্ন জমার রেকর্ড দেখুন: কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তিস্বীকার বা রিটার্নের রেকর্ড রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।

৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে ব্যবস্থা নিন: যে করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করুন। দেরির কারণে কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা-ও যাচাই করুন।

৪. জরিমানার নোটিশ পেলে যোগাযোগ করুন: কোন করবর্ষে এবং কী কারণে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।

অনলাইনে রিটার্ন জমার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
রিটার্ন দাখিলের সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য যথাযথভাবে দিতে হবে। প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর এবং উৎসে কর্তিত করের তথ্যও যাচাই করা জরুরি।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য দেবেন না।

২০২৬-২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু শ্রেণির করদাতা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ই-টিন থাকা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সবার ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—এমন তথ্য সঠিক নয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে আগের আয় নিরূপণ, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করা হয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করুন। রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত