ক্ষমতায় গেলে শিক্ষিত চোরেরা জনগণের একটা পয়সাও চুরি করতে পারবে না: জামায়াত আমীর
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “জামায়াত যদি ক্ষমতায় যেতে পারে, তাহলে শিক্ষিত চোরেরা জনগণের একটি পয়সাও চুরি করে খেতে পারবে না। আর যারা জনগণের ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের পেটে হাত ঢুকিয়ে জনগণের সম্পদ বের করে আনা হবে।”
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় সংঘটিত হয়েছে সাতক্ষীরায়। দেশের আর কোনো জেলায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়নি। বুলডোজার দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ৪৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে, অনেকের হাত-পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তারা কি কোনো অপরাধ করেছিল?
তিনি বলেন, “২০১৫ সালে আমি সাতক্ষীরায় এসেছিলাম। মোটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করেছিলাম। সেদিন আমি বেড়াতে আসিনি। এসেছিলাম দ্বীনদার ও ঈমানদার ৪৮ জন শহীদের পরিবারের খোঁজ নিতে, তাদের পাশে দাঁড়াতে। যেসব মা ও বোনদের বিধবা করা হয়েছিল, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলাম। যেসব শিশু বাবাকে হারিয়ে অন্ধকারে পড়ে গিয়েছিল—যারা চেয়ে চেয়ে দেখছিল, ‘আমাদের বাবা আর আসে না কেন’—তাদের চোখের পানি মুছতে এসেছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “যেসব যুবকের হাত-পা কেটে নেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রশ্নের অংশীদার হতে এসেছিলাম। তাদের মায়ের চোখের পানি দেখেছি, রক্তের দাগ দেখেছি। কিছু মা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন—‘আমার সন্তানের কী দোষ ছিল? কেন তাকে হত্যা করা হলো?’ আমি তাদের বলেছিলাম, আপনার সন্তানের তথাকথিত দোষের জবাব আল্লাহ দিয়েছেন। কারণ, তারা আল্লাহ ছাড়া কাউকে কর্তৃত্বশালী মানেনি। একমাত্র প্রশংসা আল্লাহর জন্য—এটাই ছিল তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’। আপনার সন্তান আল্লাহকে ভালোবেসে জীবন দিয়েছে। এই বিচার দুনিয়াতে পাব কি না জানি না, তবে ইনশাআল্লাহ আখিরাতে বিচার অবশ্যই হবে।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০১৫ সালে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় সফরের সময় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে বঞ্চনা ও অবহেলার অভিযোগ শুনেছেন। অনেকেই তাকে জানিয়েছিলেন, সরকার সাতক্ষীরাকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেনি। এই জেলার সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তারা ভেবেছিল এই অবস্থা চিরকাল চলবে। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, আবার যাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেন।
জামায়াত আমীর বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে, এমনকি একপর্যায়ে দল নিষিদ্ধও করা হয়েছে। বহু মানুষকে আটক রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরার মানুষের সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ ছিল ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, যারা ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে থাকে, আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তাদের সম্মানিত করেন।
তিনি জানান, দলের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কোনো ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। আমাদের নেতাকর্মীরা কোথাও চাঁদাবাজি করেনি, কাউকে অন্যায়ভাবে মামলা দেয়নি। যারা অপরাধ করেছে, শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলও গত ১৫ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিক, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় জুলুমের শিকার মানুষই পরে জালিমে পরিণত হয়। তাই সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার গঠনের লক্ষ্যে সমর্থন চান জামায়াত আমীর। তিনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে এবং যারা দেশের জন্য অধিক সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হবে।
ভোট প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ভোট মানে দুটি পথ—হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ মানে স্বাধীনতা, না মানে পরাধীনতা।” তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
জামায়াত আমীর আরও বলেন, “আমরা যুবকদের কোনো বেকার ভাতা দেব না। বেকার ভাতা দেওয়া মানে যুবসমাজকে অপমান করা। যুবকরা ভাতা চায় না, তারা কাজ চায়। আমরা যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। এজন্য সবাইকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে।” এ সময় তিনি সাতক্ষীরার চারটি আসনেই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমীর শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম। পাশাপাশি ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: