• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বিতর্ক : বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কার পথে! (ভিডিও)

​​​​​​​নিয়াজ মাখদুম

প্রকাশিত: ১৭:৫৩, ১১ মে ২০২২

আপডেট: ১৮:২৭, ১১ মে ২০২২

ফন্ট সাইজ

শ্রীলঙ্কার জাতীয় দৈনিক দ্য আইল্যান্ড-এর মতামত পাতায় একজন লিখেছেন, ‘যে মানুষটি কোনোদিন শ্লোগান তো দূরের কথা, জোরেও কথা বলেনি, রাজনীতি নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি সে এখন রাজপথে। যে পরিবারের বাইরে কখনো সময় কাটায়নি সে ফিরছে না মিছিল থেকে। যে মা সবসময় আগলে রাখতে পছন্দ করতো সেও সন্তানকে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিক্ষোভে সামিল হতে।‘

বর্তমান পরিস্থিতি শুধু উত্তপ্তই নয়, আগুনে পুড়ছে দ্বীপ রাষ্ট্রটি। ক্রমশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জনগণের প্রতিবাদ প্রথমে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও এখন সরকারে থাকা লোকেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, দেশ ছেড়েছেন অনেকেই। বিক্ষোভকারীদের হামলায় মারাও পড়ছে। নিজেকে বাঁচাতে আত্মহত্যা করেছেন একজন সাংসদ। চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মাহিন্দা রাজাপাকশে। এখন তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে চলছে বিক্ষোভ-সহিংসতা।

দুই কোটি জনসংখ্যার দেশটির অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার পর তাদের বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধই শুধু অনিশ্চয়তায় পড়েনি, নাগরিকদের নূন্যতম সুযোগ-সুবিধাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হয়েছে চরম সংকট। বলাহচ্ছে বিদেশি ঋণনির্ভর অপ্রয়োজনীয় মেঘা প্রকল্প আর ক্ষমতাশীনদের দুর্নীতিই প্রায় শতভাগ শিক্ষিতদের দেশটির ভরাডুবির কারণ। এ অবস্থায় কথা উঠেছে, এই বাংলাদেশের সামনেও এমন ঝুঁকি আছে কি না?

গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশেও এমন অবস্থা হতে পারে। ঠিক এই মুহূর্তে না। আরো কিছু সময় লাগবে। ৫-৬ বছর লাগতে পারে। আমরা যে পথে আছি, তাতে শ্রীলঙ্কার মতো হওয়া সম্ভব। তখন এটা থেকে বের হয়ে আসতে আমাদের ১২-১৫ বছর লাগবে।

রেজা কিবরিয়া বলার চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টগুলো পরিকল্পিত নয়। যেসব মেগা প্রজেক্ট করা হয়েছে তার বেশকটি থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সুবিধা এখনও পাচ্ছে না। যা দেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

শ্রীলঙ্কার বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ‍উঠে এসেছে করোনার কারণে পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়া। দেশটির জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি আয় হতো এই খাত থেকেই। দুই বছর ধরেই প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে তা। এ ছাড়া করোনার সময় রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স কমে গেছে। অর্গানিক কৃষি চালু করতে গিয়ে উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়া নানা মেগা প্রকল্পের জন্য নেয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে ভীষণ চাপে পড়েছে রিজার্ভ। এটি নেমে এসেছে দুই বিলিয়ন ডলারে। চলতি বছর যে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, সে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রাও নেই দেশটির।

আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা রেজা কিবরিয়া বলেন, বাংলাদেশ যে পথে আছে এটা খুবই ভয়ানক। এই সরকার যদি সামনে ৬ বছর ক্ষমতায় থাকে আমাদের শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হওয়া সম্ভব। মেগা প্রজেক্ট যেগুলো চীনের সাহায্যে হয়েছে, সেগুলোর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশের বড় কয়েকটি প্রকল্প থেকে আয় হবে না অনেক বছর। এটা খুবই ক্ষতিকর দেশের জন্য।

তিনি বলেন, কক্সবাজারের একটি রেলওয়ে লাইন এটারও ভভিষ্যৎ নেই। চট্টগ্রামে একটি টানেলেও অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা কম। মোংলা বন্দরের সফলতার সম্ভাবনা অলমোস্ট জিরো। এতোগুলো টাকা এখানে নষ্ট করেছে কেন? মেগাপ্রকল্প দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের খুবই পছন্দ। কারণ মেগাকমিশন পাওয়া যায়। সমস্যা হলো-টাকা যে খরচ করে এবং চুরি করে এই সব টাকাগুলো ঋণের বোঝা হয়ে উঠে। জনগণকেই সেই ঋণগুলো শোধ করতে হবে।

আমেরিকার উদাহরণ টেনে রেজা কিবরিয়া বলেন, দেশটি ১৮৬০-১৮৮০ পর্যন্ত ইউরোপ থেকে অনেক ঋণ দিয়ে রেলওয়ে করেছে। তাদের প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে গিয়েছিলো। ফলে ঋণ শোধ করতে সমস্যা হয়নি। তারা যদি ওই টাকা খেয়ে ফেলতো তাহলে বিপদ আসতো। ঋণ নিয়ে প্রডাক্টিভ কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের ইনভেস্টমেন্টগুলো থেকে তেমন কোনো ফল পাব না।

এদিকে, লঙ্কান বিশ্লেষকরা বলেছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ আর বর্তমানে রাজাপক্ষে পরিবারের গোষ্ঠীতন্ত্র, খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, জ্বালানি তেলের সংকট, ভুল নীতি, ভুল প্রকল্প বাছাই এবং দুর্নীতির কারণেই শ্রীলঙ্কা আজকের এই অবস্থানে।

এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি হবে না। কারণ করোনায় বাংলাদেশের রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও রপ্তানির গতি ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। পর্যটন নির্ভরতা নেই বাংলাদেশের।

গত ৬ এপ্রিল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির বাংলাদেশে আবাসিক প্রতিনিধি এডিমন গিনটিং বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা খুব ভালো। এ ছাড়া জিডিপির তুলনায় ঋণ-অনুপাত সহনীয় অবস্থানে আছে। সুতরাং ভয়ের কোনো কারণ নেই। শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশ তাই সংকটে পড়বে না।’

সিনিয়র সাংবাদিক কাশেম হুমায়ুন তাঁর ফেসবুক পোস্টেও এমন ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশ কেন শ্রীলংকা হবে না তার একটাই যথার্থ উত্তর

শ্রীলংকা - ৮৬.৮০% Debt vs GDP ratio। আর বাংলাদেশ - ২৯.৩০% debt vs GDP ratio। সুতরাং পরিসংখানই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ কখনো শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঋণের হার এখন জিডিপির ৩৮ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেনার পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। এর প্রায় ৩৭ শতাংশ এসেছে বিদেশি উৎস থেকে। বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের হার জিডিপির ১৩ শতাংশ। আইএমএফের হিসাবে এই হার ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত সহনীয়।

শ্রীলঙ্কার প্রসঙ্গ টেনে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ৬ বছর আগে তাদের কিছু পরিসংখ্যাণ দেখে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে একটি নোট পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা আমার নোট নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন। তখন বলেছিলো- বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ শ্রীলঙ্কার শক্তি বুঝে না। শ্রীলঙ্কার জাতি একটি ভদ্র এবং শিক্ষিত। কিন্তু এখন তাঁরা তাদের জনপ্রতিনিধিদের উপর রেগে আছেন।

রেজা কিবরিয়ার মতে, আমাদের দেশের তফাত হলো এমপিরা জনগণের ভোটে সংসদে যায়নি। তাই আত্মমর্যাদায় একটি ঘাটতি আছে। সেদেশে একজন এমপিকে জনগন ঘেরাও করে মারধর করছে। মার সহ্য করতে না পেরে নিজের লাইসেন্স বন্দুক দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বন্দুকের লাইসেন্স করছে, রিনিউ করছে  বলেও দাবি করে গণ অধিকার পরিষদের আহবায়ক।

অন্যদিকে, অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ ‘বাংলাদেশের দশাও কি শ্রীলঙ্কার মতো হতে পারে?’ এই শিরোনামে একটি মতামতে লিখেছেন, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আয় ও ব্যয় বাড়ার সুযোগে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, এমনকি বিদেশি সাহায্যের পাইপলাইনের অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো হওয়ায় বাংলাদেশের নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমদানি বৃদ্ধি, সঠিক পরিকল্পনা না করে বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ, প্রবাসী আয়ে ভাটা, ব্যাপক দুর্নীতি, সরকারি দলের কর্মী বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব আর রাজনৈতিক অপশাসনের কারণে যেকোনো অঘটনের আশঙ্কাকে আবার সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন মামুন রশীদ।

বিভি/এনএম

মন্তব্য করুন: