মেট্রোরেলের লোগো তৈরি হলো যার হাতে ! (ভিডিও)
ছবি: আলী আহসান নিশান
‘মেট্রোরেলের জন্য আমার লোগোর ডিজাইনটি সিলেক্ট হয়েছে, আর সেটি পছন্দ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী, সংবাদটি শুনে আমি কিছুক্ষণ ঠাই দাড়িয়ে যাই। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না। বার বার সেখানে লোগো সিলেক্টেডের জায়গায় নিজের নাম চেক করছিলাম, আসলেই এটি আমার নাম কিনা !’
নিজের অনুভূতির কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন মেট্রেরোলের লোগো ডিজাইনার আলী আহসান নিশান। উদ্বোধনের একদিন আগে মেট্রোরেলের লোগো ডিজাইন প্রসঙ্গে বাংলাভিশনের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কৃতি শিক্ষার্থী আলী আহসান নিশান। বর্ণনা করেন কিভাবে তৈরি হলো এই লোগো। জানালেন কোন কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে ডিজাইনটিতে।
মেট্রোরেলের লোগো
বলছিলেন, লোগোর উপরে ঢাকা মেট্রোরেলের "ডি" অক্ষরটা দিয়ে মুলত শুরু হয়েছিলো লোগো ডিজাইনের কাজ। এরপর সেটাকে লাল রঙে রাঙিয়ে দেশের সুর্যের রশ্মিতে পরিণত করা। অর্থাৎ একটা নতুন লাল সূর্য উঠছে । আর নিচে বাংলার সবুজ আভা। এই দু’য়ে মিলে আমাদের বাংলাদেশ। এর সঙ্গে নির্দেশনা মোতাবেক মেট্রোর ‘এম’ অক্ষরটাও এমনভাবে বসানো যে, দেখে মনে হয় যেন প্ল্যাটফর্ম। রেলটির দিকে কিছুক্ষণ তাকালেই মনে হবে, ওটা স্থির নয়, ছুটে চলেছে। উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়াই যেন ইঙ্গিত করছে ওটা।
এসব মিলেই মেট্রোরেলের লোগো। প্রতিযোগিতায় লোগোটি চূড়ান্ত নির্বাচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং। লোগোটি যিনি বানিয়েছেন তিনি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া চারুকলার এক সময়কার বর্ষসেরা শিক্ষার্থী নিশান। বাংলাভিশনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিশান জানালেন লোগো তৈরির গল্প।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার শুরুটা কীভাবে জানতে চাইলে নিশান বলেন, ‘তখন মাত্র পাস করে বেরিয়েছি। ভালো রেজাল্টের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদকও নিয়েছি। কিন্তু তখনো বেকার। তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ করে উঠতে পারিনি। তাই বিভাগের স্যারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি কাজের জন্য।'
‘একদিন বিভাগে শিক্ষকের কাছে যাওয়ার পর তিনি আমাকে এই লোগো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বললেন। তখন আমার কাছে ওটা ছিলো স্বপ্ন পূরণের আহ্বানের মতো। আমি তিনটি লোগো করে জমা দিই। অনেকেই জমা দিয়েছিল। তার মধ্য থেকে প্রতিযোগীতার জন্য আমাদের চারুকলা থেকে তিনটি লোগো পাঠানো হয়। যার মধ্যে আমার দুইটি, আরেকজনের একটি।’
এরপর জাতীয়ভাবে জমা হওয়া লোগোগুলো থেকেও শর্টলিস্ট করা হয়। সেখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার লোগোটি চূড়ান্ত করেন, বলছিলেন নিশান। লোগো চূড়ান্ত হওয়ার খবর শুনে কেমন লেগেছে? অনুভূতি প্রকাশে আলী আহসান নিশান যেন কিছুটা সেই মুহূর্তেই চলে গেলেন। বললেন, ‘এটা কিছুতেই বলে বোঝানো সম্ভব নয়! সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি !’ ‘মেট্রোরেলের স্টেশনে যে সাইনগুলো থাকবে, সেগুলোও আমার করা। দেশের মানুষ যে জিনিসগুলো ব্যবহার করবেন সেখানে আপনার সম্পৃক্ততা আছে যখনই জানবেন, সেটার অন্যরকম একটা অনুভূতি হবেই।’
সাইনের কাজ করতে গিয়ে কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হয়েছিলো প্রশ্নে জানালেন, ‘দেশের সব স্তরের মানুষ যেন চিহ্নগুলো দেখেই বুঝতে পারেন কোনদিকে যেতে হবে, টয়লেট কোনদিকে, টিকিট কোথায় পাবেন— এসব ভাবতে হয়েছে। আমি রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে নানা জনকে জিজ্ঞেস করেছি। চিহ্নগুলো দেখিয়ে জানতে চেয়েছি, এইটা কী? যখন দেখেছি চিহ্ন দেখেই বলে দিতে পেরেছে এখানে টিকিট দেবে, তখন সেটাই চূড়ান্ত করেছি।’
একবারেই লোগো চূড়ান্ত হয়েছিল, নাকি কয়েকবার কাজ করতে হয়েছে? নিশানের উত্তর—“প্রথম ধাপে চূড়ান্ত হওয়ার পর কয়েকদফা কাজ হয়েছে। ‘এম’ অক্ষরটির জন্য আগে থেকেই নির্দেশনা ছিলো, কেননা বিশ্বের ৩৫টি দেশে মেট্রোরেলের লোগোতে ‘এম’ রয়েছে। তাই ওটাকে যুক্ত করার সময় একটু ইনোভেটিভ ওয়েতে করেছি,দেখে যেন মনে হবে 'এম' দিয়ে প্লাটফর্ম বানিয়েছি।”
নিশান আরও বললেন, ‘পুরো কাজ শেষ করতে ছয় মাসের মতো লেগেছে। কাজটি নিয়ে আমি ভীষণ উত্তেজিত ছিলাম। অনেক প্রতিষ্ঠানের লোগো বানিয়েছি, কিন্তু এতোটা ভালোলাগা কাজ করেনি কখনো। বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হওয়ার আনন্দ অবশ্যই অন্যরকম।’
বিভি/এমআর



মন্তব্য করুন: