• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬

অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারণাপত্র: বাংলাদেশে আসবে টাকার বন্যা

মো. সুলতান উদ্দিন

প্রকাশিত: ১৯:৪৯, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারণাপত্র: বাংলাদেশে আসবে টাকার বন্যা

বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশের তালিকায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবনায় রয়েছে- থ্রি-জিরো নিশ্চিতকরণ, সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ।

প্রেক্ষাপট
অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য বাংলাদেশকে সম্ভাবনার এক স্বর্গরাজ্য হিসেবে অভিহিত করা যায়। এইসব সম্ভাবনাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।

কৃষিপ্রধান, কৃষিনির্ভর এই বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে কৃষি এবং জনসংখ্যার আধিক্যই হতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূখ্য চালিকাশক্তি। কিন্তু ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশে মোট কৃষি জমি ছিল প্রায় ৯.৭ মিলিয়ন হেক্টর। বর্তমানে (২০২৪ সালের আনুমানিক তথ্য অনুযায়ী) কৃষি জমি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮.০ মিলিয়ন হেক্টর।যদি বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি জমি নেমে আসতে পারে ৬.৫ মিলিয়নহেক্টর-এ। এতে খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কৃষি জমির ক্রম হ্রাস ও সার্বিক প্রেক্ষাপটের কারণে আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের চাহিদার আলোকে লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রা নিরূপণ,কৃষি জমির সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাবনার সমন্বয় সাধন, কৃষিপ্রকৃয়াজাতকরণ/ কৃষি শিল্পায়ন, কৃষিকে আধুনিকায়ন, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, জাত উন্নয়ন, উন্নত পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতায় সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সম্ভাবনার সঠিক ব্যবস্হাপনায় সৃজনশীলতার প্রযোগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে বাংলাদেশে আসবে টাকার বন্যা এবং আমাদের দেশকে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশের তালিকায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনা (গাইডলাইন) টিতে ১০টি ক্ষেত্র /সম্ভাবনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যানিক তথ্য, কয়েকটির বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগের চিত্র ও স্ট্রেটিজি তুলে ধরা হয়েছে। কিছু সেক্টর / সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে, কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রচারণা ও আন্তরিক স্বদিচ্ছার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন উদ্যোগ গ্রহণই যথেষ্ট ।

আমার প্রস্তাবিত উদ্যোগ এবং সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ
৪.১) প্রাকৃতিক মৎস্যঃ

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৫০.১৮ লাখ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদন হয়েছে। দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্যখাতের অবদান প্রায় ২.৫৩% বাংলাদেশে হাওড় বাওড় এর সংখ্যা ৪২৩টি। বাওড় বাংলাদেশে (হাওড় + বাওড়) এর মোট আয়তন প্রায় ৮.৫৫ লাখ হেক্টর। মোট মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৩.০৪ লাখ মেট্রিক টন/বছর। পুকুরের তুলনায় হাওর-বাওড় ২.১৭ গুন বেশি অথচ মাছের উৎপাদন ৮.৪৪ গুন কম।

বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা প্রায় ৪০৫ থেকে ৪৭০টি (Basin-wise হিসাব অনুসারে)।এর মধ্যে প্রায় ২০০টিরও বেশি নদী বর্তমানে মৃতপ্রায় বা সম্পূর্ণ মরা নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বাংলাদেশে বিল, ঝিল, নালা ও খাল এর মোট আয়তন ১১,১৬,৮৫৭ হেক্টর। বর্তমানে কচুরীপানা বা অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ এর কারনে এইসব বিল-ঝিল-নালা-খাল এর প্রায় ৩০%–৪০% আংশিক বা সম্পপূর্ন ভাবে মৎস্য বিচরণের জন্য অনুপযোগী বা আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে গেছে।

অতি সংক্ষেপে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এবং প্রত্যাশিত ফলাফলঃ
১) হাওর-বাওড় এবং মরা নদীগুলোতে ২ কিলোমিটার দূরে দূরে ১ একর জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বসবাস উপযোগী গভীরতার গর্ত করে মাছের যৌথ বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করে অভয়ারণ্য তৈরি করা। স্বাভাবিক প্রকৃয়ায় সেখানে মাছের উৎপাদন কমপক্ষে অতিরিক্ত ১০ গুণ বেড়ে ৪১ লক্ষ মেট্রিক টন হওয়ার প্রত্যাশা করি।

২) মরা নদী বা দেনদী ও খাল-বিল-নালার মোট আয়তন( ৮.৪ +১১.১৭) = ১৯.৫৭ লক্ষ হেক্টর। কচুরিপনা পরিস্কার ও মাছের পোনা অবমুক্ত করে জলজ প্ল্যাংকটন অথবা মাছের স্বাভাবিক পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক জলজ উদ্ভিদের সমন্বয় ঘটিয়ে উক্ত আয়তনে মাছের উৎপাদন ২.৮৭ লক্ষ টন উৎপাদনের স্হলে অতিরিক্ত ২ গুন অর্থাৎ  ৩৯.১৪ লক্ষ মেট্রিকটন অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রত্যাশা করি।

আমরা জানি প্রাকৃতিক জলাশয়ে বেড়ে উঠা মাছ যেমন শিং, কৈ, টেংরা, পুটি, চিংড়ি, টাকি, রুইকাতলা, শোল, কার্ফু, ইত্যাদি মাছের বাজারমূল্য সবসময়ই বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে প্রতি  (৭০০টাকা/কেজি) মেট্রিক টনের গড় বাজারমূল্য ৫৮৩৩.৩৩ মার্কিন ডলার ধরে ৮০.১৪ লক্ষ মেট্রিকটনের গড় অতিরিক্ত জাতীয় আয় প্রায় ৪৬,৭৪৮.৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হবে।

৪.২) বেদে সম্প্রদায় ও তাৎপর্যপূর্ণ সাপের বিষ :
অসীম সম্ভাবনাময় বেদে সম্প্রদায়: বাংলাদেশে বসবাসকারী ১৪ লক্ষ উচ্ছিষ্ট/ সুবিধাবঞ্চিত বেদে নর-নারীই হয়ে উঠতে পারে এদেশের অর্থনীতির জন্য এক সম্ভাবনাময় সম্পদ। সম্প্রদায়গত ভাবেই যেহেতু তারা সাপের জীবন বৈচিত্রের সাথে পরিচিত এবং সাপ পালনে অভ্যস্হ। তাই তাদের মধ্য থেকে কমপক্ষে ১ লক্ষ পরিবারকে এক একটি সাপের খামারের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা যায়।  

সাপের বিষ স্বর্ণের চাইতেও প্রায় ৩ গুন দামী, ইহা এক মহামূল্যবান সম্পদ যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। 

বিনিয়োগ ও আয়: প্রতি ৫ হাজার উদ্যোক্তা পরিবারের জন্য এক একটি সর্প ভিলেজ নির্মাণ করা যেতে পারে। স্হায়ী অবকাঠামোর মধ্যে তিনরুমের ঘর সাথে বারান্দা ও আনুষাঙ্গিক, তিনখোপ বিশিষ্ট সাপের ঘর, সাপের খামারে খাবারের জন্য একটি ছোট জলাশয়। পুরো ভিলেজের জন্য একটি প্রাইমারি কাম হাইস্কুল, একটি হাসপাতাল, একটি মসজিদ, চারটি খেলারমাঠ ও একটি ছোটপার্ক ইত্যাদির প্রয়োজন। 

সাপের খামারের জন্য আলাদা কম্পাউন্ড রেখে পরিবারগুলোর বসবাসের জন্য আলাদা চার বা তদুর্ধ তলা ভবন নির্মাণ করলে ৫০ একর জায়গায় সংকলন হয়ে যাবে। আর প্রত্যেকটা উদ্যোক্তা পরিবারকে সাপের খামারসহ আলাদাভাবে রাখলে প্রায় ৪০০ একর জায়গার প্রয়োজন হবে। সমস্ত অবকাঠামো এবং সাপ প্রতিপালনের ব্যয়সহ প্রতি উদ্যোক্তা বাবদ আনুমানিক মোট বিনিয়োগ হতে পারে ২৭ লক্ষ টাকা। অতএব ১ লক্ষ উদ্যোক্তা পরিবারের জন্য: সম্ভাব্য বিনিয়োগ: ২২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সম্ভাব্য জাতীয় আয়: ৭২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ।

কাজেই যত্রতত্র কোনভাবে বেচে থাকা সুবিধা বঞ্চিত, অধিকার বঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়কে বিভিন্ন রিমোট এলাকায় সরকারি খাস জমিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা যেমন স্হায়ী বাসস্হান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে সাপের খামারের গর্বিত উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে রাষ্ট্রতার অর্পিত দ্বায়িত্ব পালন করতে পারে। আর্থ-সামাজিক এবং একই সাথে মানবিকতার দিক থেকে এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিশ্চিত হতে পারে এক অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

৪.৩) সবজি জাতীয় আবাদে বসত বাড়ির প্রতি ইঞ্চি জায়গার সর্বোচ্চ ও সঠিক সমন্বিত ব্যবহার পরিকল্পিত এবং জমির প্রতি ইঞ্চি জায়গার সঠিক ও সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে চাষাবাদ তাদের সুষম পুষ্টির যোগান এবং সর্বোচ্চ আর্থিক লাভ নিশ্চিত করতে পারে। এক্ষেত্রে বাড়ির সার্বিক অবস্থা যেমন: ছায়াযুক্ত, রুদ্রময়তা স্যাঁতস্যাঁতে, ঘরের চাল, গাছ, ঘরের পাশ, ঢালু, উঁচু-নিচু, ব্যবহৃত-জিনিস/ জায়গা ইত্যাদি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে যথোপযুক্ত ডিজাইন অনুযায়ী আবাদ করে অধিক ফলন নিশ্চিত করা যায়।

৪.৪) এক বিঘা জমিকে কমপক্ষে ১০ বিঘায় রুপান্তর: 
এক বিঘা কৃষিজমিকে কমপক্ষে ১০ বিঘায় রুপান্তর করার এই পদ্ধতি সমস্ত ফসলের জন্য কার্যকর হবে না। লতা জাতীয় সবজি যেমন : উইস্তা/করল্লা, চিচিংগা, কাকরোল, সীম, শসা, লাউ, কুমড়া, ঝালিকুমড়া, ধুন্দল ইত্যাদির জন্য এই পদ্ধতি অধিক কার্যকরী। দেখা যায় এই ধরনের লতা জাতীয় উদ্ভিদ যতবেশি খোলামেলা জায়াগা পায় ততই সাবলিলভাবে বাড়তে থাকে। তাই মাটির সাথে লম্বা বা খাড়া রেখার এই পদ্ধতির মাধ্যমে এদেরকে বৃদ্ধির সুযোগ করে দিলে অধিক এবং মানসম্মত ফলন নিশ্চিত হবে।কোন ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে অথবা উক্ত ফসলের সাথে অন্য ফসলের সমন্বিত চাষাবাদে ও এই পদ্ধতি ভালো ফলন দেয়। 

পদ্ধতির ধরন: প্রচলিত পদ্ধতিতে লতা জাতীয় সবজি চাষে মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় । তাতে জমির আয়তনের সমান পরিমাণই শুধু মাত্র ব্যবহার করা যায়। আর লম্ব পদ্ধতিতে এই মাচাটাকেই খাড়া ভাবে অর্থাৎ ভূমির সাথে লম্বা রেখা বরাবর স্থাপন করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এই পদ্ধতির জন্য মোটা খোপওয়ালা কম-বেশি ১৫ ফুট (ইচ্ছেমত) প্রস্থের প্লাষ্টিকের নেট জাল লম্ব রেখা বরাবর মাটি থেকে ৩ ফুট উপর পর্যন্ত ঝুলিয়ে দিতে হবে। উক্ত ফসলগুলোর ক্ষেত্রে প্রচলিত চাষ পদ্ধতিতে সারি থেকে সারির এবং চারা থেকে চারার যে স্বাভাবিক দূরত্ব থাকে তার চেয়েও অনেক কম দূরত্ব দেওয়া যায়।

(১) প্রচলিত মাচায় ঘিঞ্জি পরিবেশ সৃষ্টি করে আর এই মাচা থাকে খোলামেলা।
(২) সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পড়তে পারে।
(৩) পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ সহজ হয়। 
(৪) এই মাচার খরচ প্রচলিত মাচার তুলনায় অনেক অনেক কম এবং একবার স্হাপন করলে বহুবছর পর্যন্ত একই মাচা ব্যবহার করা যায়।  তবে এই পদ্ধতিতে উদ্ভিদ বেড়ে উঠার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করলে ভালো হয়।
(৫) স্বমন্বিত চাষেও এই পদ্ধতি অধিক কার্যকর হয়।
(৬) ফসল সংগ্রহ সহজ হয়। 
(৭) সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পড়তে পারে তাই তা থেকে উদ্ভিদ বাড়তি পুষ্টি পায়।
(৮) এই পদ্ধতিতে একবার মাচা তৈরি করে নিলে তা কমপক্ষে ১৫-২০ বছর টিকে থাকে তাই মাচার জন্য বাড়তি খরচ বেঁচে যায়।

বাংলাদেশে মোট সবজি উৎপাদনের প্রায় ৩০–৩৫% আসে লতা জাতীয় সবজি থেকে। এই শ্রেণির ফসল রপ্তানিযোগ্যও (বিশেষত করল্লা, সীম, কুমড়া, লাউ ইত্যাদি)। গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় পারিবারিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এটি। 

বর্তমানে বাংলাদেশে লতা জাতীয় সবজির সর্বমোট ফলন বছরে ৪১-৪২ লক্ষ মেট্রিকটন। আর খাড়া বা লম্ব রেখার এই পদ্ধতিতে সর্বমোট অতিরিক্ত উৎপাদন হবে কমপক্ষে ১০ গুন অর্থাৎ ৪১০-৪২০ লক্ষ মেট্রিক টন। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র পদ্ধতির সুফল বিষয়ে প্রচারণা করতে হবে। প্রতি কেজি সবজির গড় বাজারদর ৭০ টাকা ধরে হিসাব করলে জাতীয় জিডিপিতে বছরে ২৩৯১৬-২৪৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ হবে। এছাড়া বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে এবং প্রক্রিয়াজাত/কৃষি শিল্পায়নের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত জিডিপি কমপক্ষে দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।

৪.৫) একটি আদর্শ বসতবাড়ি বাণিজ্যিক প্রজেক্ট
বেঁচে থাকার তাগিদে বাংলাদেশের গ্রামের কর্মঠ তরুণরা তাদের জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিয়ে বছরের পর বছর সন্তান-সন্ততি পরিবার পরিজনের সান্যিধ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ তাদের বসত বাড়িতে বিদ্যমান জায়গার পরিমাণ ও অবস্থার ভিত্তিতে উপাদানগুলোর সুবিন্যস্ত ডিজাইনে জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি আদর্শ বসতবাড়ি বাণিজ্যিক প্রজেক্টের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের আত্মকর্মসংস্থান/আত্মনির্ভরশীল এবং অন্যদেরও বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।  এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা পরিবারগুলোর বসতবাড়িই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের এক একটি বাণিজ্যিক ভিত্তি।ছাগল, গরু, মুরগি, মাছ, হাঁস, কবুতর, জৈবসার, মাছের জৈব-খাবার, হাইড্রোপনিক, পাখি, বার্ড-ফ্লাইসোলজার, কুমির, কচ্ছপ, হ্যান্ডিক্রাফট, কৃষিজ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করণ ইত্যাদির এক বা একাধিকের অপরিকল্পিত চাষ/প্রতিপালনের পরিবর্তে সর্বাধিক উপাদানের যথোপযুক্ত সমন্বয়ের ভিত্তিতে প্রজেক্ট কম্পোনেন্ট নির্বাচন করতে হবে ।

দেখা যায় বাংলাদেশে ২১–৩২ শতকের ৩০ লক্ষ খানা এর মধ্যে ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার খানায় পুকুর সহ এবং ৩৩ শতক বা তদূর্ধ্ব ৩০ লক্ষ খানা এর মধ্যে১৮ লক্ষ ৬০ হাজার খানায় পুকুরসহ উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা যাবে। এছাড়া ১১-২০ শতক বা অনূর্ধ্ব জায়গার বসত বাড়িগুলোতেও প্রায় ৫০ লক্ষাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা রয়েছে।শুধুমাত্র ২১ বা তদুর্ধ শতকের বসত বাড়ির সর্বমোট ৬০ লক্ষ সম্ভাব্য উদ্যোক্তা রয়েছে। 

প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্ত বাংলাদেশে বিনিয়োগ উপযোগী ১০ লক্ষখানার প্রতিটিতে গড় বিনিয়োগ ৭০ লক্ষ টাকা করে ধরা হলে মোট বিনিয়োগ করতে হবে ৫৮,৩৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মোট জাতীয় আয় হবে ৮৬,৬৬৬.৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

৪.৬) এগ্রোপ্রসেসিং/ কৃষিশিল্পায়ন :
বর্তমান যুগ হল কৃষি বিপ্লবের যুগ। উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি, সৃজনশীল প্রয়োগ পদ্ধতি ও ফসলের জাত উন্নয়নের ফলে ফলনের পরিমান বহুগুনে বেড়ে যাওয়ার সময় এসেছে। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের রয়েছে কৃষি শিল্পায়নের পর্যাপ্ত কাঁচামাল, মাছ, শাকসবজি,ফলমূল, কৃষিজাত পণ্য ইত্যাদি।

তাই এগ্রোপ্রসেসিং বা কৃষি শিল্পায়ন বাধ্যতামূলক হওয়ার সময়ে উপনীত হয়েছে।  সেক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাকে সামনে রেখে বিদ্যমান কাঁচামালের যথোপযুক্ত শিল্পায়ন প্রক্রিয়া আমাদেরকে শীর্ষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী দেশের তালিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

৪.৭) স্টাডি, রিসার্চ:  
অভ্যন্তরীণ, আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বা প্রক্রিয়াজাত পণ্য নির্বাচন ও উৎপাদন।সাপ্লাই চেইন ও ম্যানেজম্যান্ট উন্নয়ন। উৎপাদনশীল খাত নির্বাচন ও উন্নয়ন।সমন্বিত ব্যবস্হাপনা নির্ধারণ। সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।স্হায়ী শিল্পায়নের লক্ষ্যে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের ক্রম প্রায়োরিটি চিহ্নিত করণ। ভায়াবিলিটি নিরুপণ। বাস্তবায়ন পলিসি, স্ট্র্যাটিজ, পদ্ধতি নির্ণয়। নির্ধারিত পণ্য উৎপাদনের জন্য সাশ্রয়ী কাঁচামাল, সাশ্রয়ী খাদ্য, সহযোগী উপাদান নির্বাচন/উদ্ভাবন/ উন্নয়ন।

৪.৮) শিক্ষা:
শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিত করা। উদ্যোক্তা উন্নয়ন, মেধাবিকাশ, সৃজনশীলতা, উৎপাদনশীলতার চর্চা, নৈতিক শিক্ষা, এগ্রোপ্রসেসিং, কৃষিতে শিল্পায়ন, ইংরেজির বাস্তব ভিত্তিক প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়কে প্রধান গুরুত্বের তালিকায় রাখা উচিৎ। শিক্ষা ব্যবস্থার কোন স্তরে কোন বিষয়, অধ্যায় কি পরিমান এবং কিভাবে উপস্থাপন করা দরকার তা ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসেব করে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ।

৪.৯) ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত পোল্ট্রি সেক্টর :
বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় ডিম একটি আবশ্যিক খাবার। এছাড়া মুরগির মাংস ছাড়া আমাদের চলেই না। আমাদের খাদ্য ও আমিষের ঘাটতি পূরণ, আত্মনির্ভরশীল, বেকারত্বদূরী করণে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য পোল্ট্রি সেক্টর অতি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি বর্তমানে সেক্টরটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। কিছু খারাপ দিক যেমন দুর্গন্ধ, পোল্ট্রি বর্জ্য ইত্যাদি পোল্ট্রি সেক্টর এবং মানুষের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্হাপনাই এই সমস্যাগুলোকে সম্পদে পরিণত করে নিশ্চিত করতে পারে বহুমুখী সুবিধা। সেই লক্ষ্যে “পোল্ট্রি সেক্টরের সম্ভাবনাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে গ্রীণ এবং স্হায়ী উন্নয়ন” শিরোনামে একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনর প্রয়োজন রয়েছে ।

উক্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক ফলাফলের জন্য ২ হাজার, ৫ হাজার ও ৮ হাজার বার্ড ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পোল্ট্রি ফার্মকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় এনে অনুরূপ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত ব্যবস্থাপনার পোল্ট্রি ফার্মের সাথে তুলনামূলক রেংকিং ইনফর্মেশন সংগ্রহ করা হবে। পোল্ট্রি সেক্টর ও ইহার সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র সমূহের সাপেক্ষে সার্ভে, ওয়ার্কশপ, ওরিয়েন্টেশন করে বিশেষজ্ঞ বোর্ডে তা ক্রসডিসকাশন করা হবে। উক্ত সেক্টরের সম্ভাবনাগুলোর সমন্বিত ও সঠিক ব্যবস্হাপনার মাধ্যমে যেসব অতিগুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ উন্নয়ন নিশ্চিত হবে তা হল: 

১) ইফিসিয়েন্ট এনার্জি সলিউশন ২) কার্বন ইমিউশান প্রিভেনশন ৩) অর্গানিক ফার্টিলাইজার প্রডাকশন ৪) ওয়েস্ট ম্যানেজম্যান্ট (কমিউনিটি এবং ফার্ম) ৫) গ্যাসসাপ্লাই ৬) ক্লিন ইনভানর্ম্যান্ট ৭) অর্গানিক এগ্রো ফার্মিং ৮) অর্গানিক ফিশিং।একই সাথে খামারের উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, খামারীর বহুমূখী অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত হওয়াসহ বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া ইফিসিয়েন্ট ও এফোরডেবল টেকনোলজি ব্যবহার, নির্ধারণ ও উন্নয়ন।সমস্ত সম্ভাবনার ইতিবাচক কার্যকারিতা নিরূপণ, উন্নয়ন ও সমন্বয়সাধন। লাভজনক সেক্টরে পরিণত করতে ঘাটতি চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণ। সম্ভাবনাগুলোর একক এবং যৌথ বাস্তবায়নে খরচ এবং ভায়াবিলিটির পরিসংখ্যানিক চিত্র, পরিসংখ্যানিক তথ্য সমৃদ্ধ বুকলেট, পলিসি এবং স্ট্রেটিজিক গাইডলাইন তৈরিই উক্ত গবেষণা কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।

উপরোক্ত গবেষণা কার্যক্রমের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বুকলেটের আলোকে শুধুমাত্র প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করলেই এবং একই সাথে বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করলে বাংলাদেশে ১০ লক্ষ পোল্ট্রি উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করি। সরাসরি কর্মসংস্থান প্রায় ৫০ লক্ষ লোকের। একই সাথে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠবে ।

একটি ৫ হাজারের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পোল্ট্রি লেয়ার ফার্মে চলতি খরচসহ এককালীন মোট বিনিয়োগ হতে পারে ১.৯০ কোটি। জাতীয় আয় (প্রচলিত) ১.৪৪ কোটি টাকা। সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে বছরে কমপক্ষে ৬.৫ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত নীট লাভ থাকবে।

(পরিসংখ্যানগত তথ্য উৎস: কৃষি পরিসংখ্যান (BBS, DAE ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ২০২৩–২৪, পরিসংখ্যান ব্যুরো, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য অধিদপ্তর) ধারণাপত্র প্রদানকারী মো. সুলতান উদ্দিন

ধারণাপত্র দিয়েছেন: মো. সুলতান উদ্দিন
পরামর্শক, গবেষক, কবি, সমাজকর্মী
ইমেইল :sultanu049@gmail.com

(প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত
Drama Branding Details R2
Drama Branding Details R2