প্রাণহীন মেলা, ক্রেতার অপেক্ষায় স্টলগুলো
মো. বেল্লাল হাওলাদার
প্রতিবছরই বইমেলায় যাওয়া হয়। একটা অদৃশ্য টান কাজ করে হৃদয় অভ্যন্তরে। এবছরও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। যদিও এবারের বই মেলায় আমার কোনো বই বেরোয়নি। তবে ‘হৃদয়ের মোহনায়’ শিরোনামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কথা ছিলো, পিডিএফ ও প্রচ্ছদের কাজও করেছিলাম। কিন্তু বইমেলা হবে কি হবে না, এই অনিশ্চয়তার ভেতর শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি ঐ গ্রন্থটি। নির্বাচন ইস্যূতে শুরুতেই মেলার তারিখ নিয়ে টালবাহানা ছিলো, এতে ধরে নিয়েছি এবারের বইমেলা হলেও একদম হযবরল টাইপ হবে নিশ্চিত। অবশেষে মেলা শুরু হয়েছে ২৬শে ফেব্রুয়ারি চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। শুরুর প্রথম দু’দিন খুব আক্ষেপ হচ্ছিলো, হয়তো ভুল করেই ফেললাম! বইটি বের করলে পাঠকের হাতে পৌঁছে যেত। কিন্তু গত ক’দিনের চিত্র দেখে এখন মনে হচ্ছে, সিদ্ধান্তটা খুব একটা অযৌক্তিক ছিল না। বরং আমার ভাবনার হযবরল বাস্তবতা ছুঁয়েছে।
আমার অনেকে প্রিয় লেখকের বই এসেছে মেলায়। তারা ইনবক্সে মেসেজ করেছেন, মেলায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কেউ জানিয়েছেন, তাদের নতুন বই এসেছে; কেউ বলেছেন, স্টলে গিয়ে একটু দেখা করে যেতে। তবুও মন টানে না। মেলায় গেলে দেখতে হবে স্টলের সামনে নেই সেই চিরচেনা ভিড়, নেই বই হাতে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য। মিলছে না লেখক-পাঠক-দর্শনার্থীদের মিলনোৎসব! প্রতি বছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে যে উৎসব আলো ছড়ায়, তা এবার যেন মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করতে পারেনি। সেজন্য এবার মেলায় যাচ্ছি না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ ফেললেই লেখক–প্রকাশকদের হতাশার সুর ভেসে আসছে। কেউ কেউ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। উঠছে না-না অভিযোগ। কিছু নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্ত এবারের মেলার প্রাণশক্তিকে ক্ষীণ করে দিয়েছে।
মেলার চিত্র সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, হতাশার এই সুর একেবারেই অমূলক নয়। স্টলের সামনে প্রত্যাশিত ভিড় নেই, বিক্রির গতি নেই। প্রকাশকদের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। নতুন বই এসেছে, লেখক উপস্থিত, তবু ক্রেতার অভাব যেন পুরো আয়োজনকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছে।
মেলাটি যদি ঈদের পরে আয়োজন করা হতো, তবে হয়তো এমন দৃশ্য দেখতে হতো না। রমজান মাসে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ব্যয়সংকোচন থাকে; সময় ও সামর্থ্য দুটোরই সীমাবদ্ধতা কাজ করে। ঈদের পর উৎসবের আবহে বইমেলা হলে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মধ্যে হয়তো ভিন্নরকম উচ্ছ্বাস তৈরি হতো। এতে বাংলা একাডেমির ক্ষতি নয়, বরং সার্বিকভাবে অংশগ্রহণ ও বিক্রির দিক থেকে লাভই হতে পারতো।
যদিও প্রকাশকগণ স্টল বরাদ্দ ফ্রি পেয়েছেন কিন্তু শুধু স্টল ভাড়া ফ্রি হলেই তো সব খরচ উঠে আসবে না। বই ছাপানো, বাঁধাই, পরিবহন, কর্মচারীর বেতন, প্রচারণা সব মিলিয়ে বড় একটি ব্যয়। যদি বিক্রি না হয়, তবে লেখক প্রকাশকদের সেই বিনিয়োগ পুষিয়ে ওঠা সত্যি কঠিন। স্টল ফ্রি পেলেও বিক্রি না থাকলে লাভের বদলে লোকসানের হিসাবই ভারী হয়ে উঠবে।
এই লোকসানের ভার কেবলমাত্র প্রকাশকদের নয় বরং লেখকদেরও। বই প্রকাশ মানে শুধু স্বপ্ন নয়; খরচ, শ্রম, প্রত্যাশা সব মিলিয়ে বড় একটি বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগ যদি পাঠকের সাড়া না পায়, তবে কষ্টটা আরও গভীর হয়। তাই এবারের প্রেক্ষাপটে বই না বের করার সিদ্ধান্তটাকে এখন আর ভুল মনে হচ্ছে না; বরং সময় বুঝে অপেক্ষা করাটাই হয়তো বিচক্ষণতা ছিলো।
বইমেলা শুধু বিক্রির জায়গা নয়, এটি আবেগের, সংস্কৃতির, আত্মপরিচয়ের জায়গা। তবু বাস্তবতার প্রশ্ন এড়ানো যায় না। যখন সামগ্রিক পরিবেশে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আয়োজন ঘিরে বিতর্ক থাকে, তখন নতুন লেখকের জন্য ঝুঁকিটা আরও বেশি।
তাই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি, বই তো থাকবে, সময়ও আসবে। হয়তো আগামী বছর, নতুন উদ্যোমে, আরও প্রস্তুতি নিয়ে, পাঠকের প্রকৃত উপস্থিতির ভেতরেই বইটি প্রকাশ করা যাবে। অপেক্ষা কখনও কখনও ভুল নয়; বরং সঠিক সময়ের জন্য শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার নামই অপেক্ষা।
লেখক: মো. বেল্লাল হাওলাদার, লেখক ও সাংবাদিক এবং প্রতিষ্ঠাতা, প্রাণের মেলা জাতীয় কবি পরিষদ।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/টিটি



মন্তব্য করুন: