• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

এক বাজার থেকেই সারাদেশে যাচ্ছে কোটি টাকার খেজুর গুড় 

প্রকাশিত: ১৫:০৩, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
এক বাজার থেকেই সারাদেশে যাচ্ছে কোটি টাকার খেজুর গুড় 

মাঘের শুরুতেই জেলার হাট-বাজারগুলোতে বেড়েছে খেজুর গুড়ের বেচাকেনা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার খেজুর গুড়ের মান ভালো। ভালো দামও পাচ্ছেন গাছিরা। রস সংগ্রহের পরে প্রান্তিক গাছি ও কৃষকেরা তাদের  তৈরি করা খেজুর গুড় বিক্রি করছেন হাটে নিয়ে। 

ঝিনাইদহ জেলার সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট ‘সাফদারপুর বাজার’। কোটচাঁদপুর উপজেলার সাফদারপুর বাজারে এই গুড়ের হাট বসে। এ বাজারে সপ্তাহে দুই দিন অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার খেজুর গুড় বেচাকেনা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রেললাইন। রেললাইনের পাশেই সাফদারপুর খেলার মাঠ। ওই মাঠেই সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার দুই দিন খেজুর গুড়ের হাট বসে। বেলা ১১টা থেকেই আশেপাশের গাছি ও কৃষকরা তাদের বাড়িতে তৈরি খেজুর গুড় হাটে নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য।

পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্তের গাছি ও কৃষকরা দুপুরের পরপর হাটে পৌঁছান নিজেদের গুড় নিয়ে। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, আলমসাধু (ইঞ্জিনচালিত) গাড়িসহ নানা উপায়ে গাছিরা তাদের গুড় হাটে নিয়ে আসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে খেজুর গুড়ের হাট। 

সাফদারপুর খেজুর গুড়ের হাট জেলার সবচেয়ে বড় হাটে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসেন এই হাটে। যাচাই-বাছাই, দাম-দর ও হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে গুড়ের হাট। এই হাটে ঝোলা গুড়, দানা গুড়, জিড়েন রসের গুড়, পাটালি সহ বিভিন্ন ধরনের খেজুরের গুড় পাওয়া যায়। যে কারণে ব্যবসায়ী ছাড়াও সাধারণ ক্রেতারাও ভিড় জমান এ হাটে।

গাছি ও গুড় বিক্রেতা আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই হাট অনেক পুরোনো। বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছি, আগেও ব্যবসায়ীরা ট্রেনে করে এসে এই হাট থেকে গুড় কিনে নিয়ে যেতো। এখনো খুলনা, যশোর, নাটোর, পাবনা ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা এখানে গুড় কিনতে আসেন। বাইরের ব্যবসায়ীরা হাটে আসেন। এজন্য আমরাও একটু ভালো দাম পাই।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জেলার ৬টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রস আহরণযোগ্য গাছের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০টি। চলতি শীত মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ, ১৪ হাজার ২৪১ লিটার খেজুর রস ও প্রায় ৮৭২ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। 

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় উৎপাদিত এসব খেজুর গুড় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে নিয়মিত সরবরাহ করছেন ব্যবসায়ী ও গাছিরা।

দোড়া গ্রামের নাজমুল হোসেন নামে একজন বলেন, হাটে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের গুড় ভর্তি এক ভাঁড় গুড় ১৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৮০০ টাকায় বেচাকেনা হয়। দাম নির্ভর করে গুড়ের মানের ওপর। যাচাই বাছাই করে এখান থেকে গুড় কিনে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। সাধারণ ক্রেতারাও আসেন গুড় কিনতে।

গুড় ক্রেতা সলেমানপুর গ্রামের তসলিম খাতুন গিনি বলেন, অনেকের আত্মীয় স্বজন বিভিন্ন শহরে বসবাস করে। শীত এলেই তাদের জন্য গুড় কিনে পাঠাতে হয়। ঢাকায় মেয়েকে গুড় পাঠাবো এবং খুলনায় দেবরকে গুড় পাঠাবো। গ্রাম থেকে না কিনে সরাসরি হাটে এসেছি, যেন দাম একটু কম হয়। হাটে এসে গুড় দেখে কিনতে পারলে ভালো হয়। ব্যবসায়ীরা ছাড়াও বহু মানুষ এই হাটে এসে গুড় কিনে নিয়ে যায়।

পাইকারি গুড় ব্যবসায়ী ও আড়তদার উজ্জ্বল কুমার সাহা বলেন, একেবারেই গ্রামের সাধারণ গাছি ও কৃষকরা এই হাটে গুড় বিক্রি করার জন্য আসে। সাফদারপুর হাটে ভেজাল গুড় খুব একটা আসে না। আমরা এখানে ভালো মাল পাই, যে কারণে এই হাট থেকে নিয়মিত মাল কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাই। এ বছর গুড়ের উৎপাদন বেশি, দামও ভালো।

সাফদারপুর গুড়ের হাটের ইজারাদার আবুল কাশেম বাবু বলেন, খেজুর গাছ কমছে, গাছিও কমছে। সরকার যদি খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে উদ্যোগ নেয়, তাহলে গাছিরা বাঁচবে। শীত এলে কৃষকরা এই খেজুর গাছের রস ও গুড় বিক্রি করে ভালো আয় করেন। সরকারি সহায়তা পেলে গুড় উৎপাদন বাড়বে। যা দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে।

তিনি জানান, প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছরের পুরনো এই হাট। প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার এখানে গুড়ের হাট বসে। সপ্তাহে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার গুড় বেচাকেনা হয় এই হাটে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এরমধ্যে রস আহরণযোগ্য গাছের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০টি। জেলায় সবচেয়ে বেশি খেজুর গাছ কোটচাঁদপুর উপজেলায়। যে কারণে উপজেলার সাফদারপুরে খেজুর গুড়ের হাট গড়ে উঠেছে। খেজুর গাছ রোপণ বৃদ্ধি ও গাছিদের পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে গুড়ের উৎপাদন বাড়বে।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত