৬ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত, ৪৫০ জনের চাকরি হারানোর শঙ্কা
দেশের ছয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে চাকরি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন ৪৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। বয়স ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হবে—এই আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। প্রয়োজনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে আর্থিক সহায়তা ও সময় দিলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় অবসায়ন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অবসায়নের পথে যাচ্ছে। যদিও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা পেলে প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার সম্ভব। এ দাবির পক্ষে আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বার্ষিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ছয়টি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কর্মকর্তা প্রায় সাড়ে ৪০০ জন।
এর মধ্যে অ্যাভিভা ফাইন্যান্সে ২০৪ জন, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৮০ জন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৫৪ জন, পিপলস লিজিংয়ে ৩৯ জন, ফাস ফাইন্যান্সে ৩৮ জন এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৩০ জন কর্মরত রয়েছেন।
গতকাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় এসব প্রতিষ্ঠানের অফিসে গ্রাহকদের উপস্থিতি খুবই কম। দিলকুশায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও মতিঝিলে অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের কার্যালয়ে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে। গ্রাহকরা বলছেন, বছরের পর বছর টাকা আটকে আছে, এখন শুধু আসল ফেরত পাওয়ার আশায় দৌড়ঝাঁপ করছেন।
অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের অফিসে গিয়ে দেখা মেলে গ্রাহক রাশেদুল করিমের। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে ১২ শতাংশ সুদে আড়াই লাখ টাকা রেখেছিলাম। এখন আর তুলতে পারছি না। আজ (বুধবার) এসেছিলাম যাতে প্রায়োরিটি লিস্টে আগে থাকা যায় সে জন্য কথা বলতে। শুনেছি বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাভিভা ফাইন্যান্স দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। গ্রাহকের কোনো সুদ নাকি দেওয়া হবে না। শুধু আসল দেবে।’
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, অবসায়নের মাধ্যমে বড় ঋণখেলাপিদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তার দাবি, শুধু আমানত ফেরত দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়, ঋণ আদায় ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ না নিলে প্রকৃত সংস্কার হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তার বক্তব্য না শুনেই প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাদের কথা না শুনেই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের সময় দিলে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। পাশাপাশি সব আমানতকারীর টাকাও ফেরত দিতে পারব।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ছয় প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া চলছে। কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত বছর ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যায়নে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান—জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না হলে সেগুলোও অবসায়নের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
বিভি/টিটি



মন্তব্য করুন: