• NEWS PORTAL

  • রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

ফারইস্ট লাইফ বাঁচাতে ফের বোর্ড গঠন

প্রকাশিত: ২২:১০, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ফন্ট সাইজ
ফারইস্ট লাইফ বাঁচাতে ফের বোর্ড গঠন

অনিয়ম আর দুর্নীতিতে ধুঁকতে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে বাঁচাতে চার শর্তে বোর্ড পুনর্গঠনের অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। 

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ওয়াহাব অ্যান্ড কো. চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেটসের প্রতিবেদনে জানা যায়, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গ্রাহকদের জমা দেওয়া টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন। 

এরপর ২০২১ সালে ১ সেপ্টেম্বর কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে প্রথমবারের ১০ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দেয় বিএসইসি। কিন্তু সেই বোর্ড কোম্পানিটির ইতিবাচক পরিবর্তন করতে না পারায় ফের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠিত বোর্ডে ছয়জন স্বতন্ত্র পরিচালক ও শেয়ার ধারণের মাধ্যমে চারজন মনোনীত পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নতুন পুনর্গঠিত পর্ষদে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান জুপিটার বিজনেস লিমিটেড ও ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে। এর মধ্যে জুপিটার বিজনেস ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। 

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, নতুন বোর্ড ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের পক্ষ থেকে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান ও বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা জামানুল বাহারকে। আর জুপিটার বিজনেস লিমিটেডের পক্ষে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আলী নেওয়াজ, বেক্সিমকো টেক্সটাইলের মহা-ব্যবস্থাপক মাসুদ মিয়া ও ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম চৌধুরীকে।

নিয়োগ পাওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকরা হলেন- শেখ কবির হোসেন, ডা. লাফিফা জামাল, মোজাম্মেল হক, মো. ইব্রাহিম হোসেন খান, শেখ মামুন খালেদ সাহেব এবং ডা. মো. রফিকুল ইসলাম। মনোনীত পরিচালকরা হলেন- আলহাজ্ব মো. হেলাল মিয়া, ফারইস্ট সিকিউরিটিজ, ট্রেডেনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল ও জুপিটার বিজনেস।

সূত্র মতে, চারটি শর্তে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। সেই সাথে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, নিয়োগ দেওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের এবং মনোনীত পরিচালকদের কাছেও অনুরূপ চিঠি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এই চিঠি জারির পর ২০২১ সালে ১ সেপ্টেম্বর মাসে জারি করা চিঠিটি বাতিল বলে গণ্য হবে। 

বিএসইসি’র দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, বিনিয়োগকারী, নীতিধারী এবং শেয়ারবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে কমিশন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠনে সম্মতি দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ছয়জন ব্যক্তি স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে এবং চারজন শেয়ার ধারণের মাধ্যমে মনোনীত পরিচালক হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পর্ষদ ফের পুনর্গঠনের শর্তগুলো মধ্যে রয়েছে- পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের বিষয়ে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সম্মতি থাকবে। সেই সংগে পরবর্তী সাধারণ সভায় পোস্ট-ফ্যাক্টো হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে। এছাড়া ট্রেডেনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ৯.৯১ শতাংশ, জুপিটার বিজনেস লিমিটেড ৯.৯০ শতাংশ এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ২ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করে আছে। এজন্য তদেরকে কোম্পানিটির মনোনীত পরিচালক হিসাবে নির্ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের মধ্য থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি হতে পারে। 

এছাড়া কোম্পানিটির পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদ কমিশনের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের নির্দেশনা অনুযায়ী কমপক্ষে স্বতন্ত্রভাবে পরিচালকদের ২ শতাংশ এবং কোম্পানির উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের দ্বারা সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার বজায় রাখার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। অপরদিকে উপরোক্ত শেয়ারসহ কোম্পানির উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের হাতে থাকা সমস্ত শেয়ার ব্লক-মডিউলের অধীনে লক-ইন থাকবে। 

বিষয়টি নিয়ে বিএসইসি’র কমিশনার অধ্যাপক ড. শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর আগেও কোম্পানিটির পর্ষদ পনর্গঠন করা হয়েছিলো। সেখানে যারা ছিলেন তারা সবাই ছিলেন স্বতন্ত্র পরিচালক। তবে বর্তমানে কোম্পানিটির কিছু শেয়ার হোল্ডিং পরিচালক রয়েছে। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় কমিশন কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ফের পুনর্গঠন করেছে।

এদিকে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গ্রাহকদের জমা দেওয়া টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিএসইসি তাদের এক চিঠিতে বলেছে, গত এক দশকে কোম্পানিটি বিভিন্ন সময়ে ৮৫৮ কোটি টাকার পুঁজি সরিয়েছে। এইসব আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। চারটি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ এর বিধি ৫৪ অনুযায়ী যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিএসইসি’র নেতৃত্বে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্যান্য সংস্থার মধ্যে রয়েছে- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএসইসি থেকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্যাহকে চেয়ারম্যান করে ১০ সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালকের একটি পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। সে সময় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পুনর্গঠিত পর্ষদের সদস্যরা ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্যাহ, মোহাম্মদ সানাউল্লাহ অ্যান্ড এসোসিয়েটসের সিইও মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল গাজী মো. খালিদ হোসেন, এসএমএসি ও এসএসএসি’র পার্টনার স্নেহাশিষ বড়ুয়া, একাত্তর মিডিয়ার এমডি অ্যান্ড চিফ এডিটর মোজাম্মেল হক, জি-৭ সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান সুজাদুর রহমান, জনতা ব্যাংকের ডিএমডি জিকরুল হক এবং নর্দান জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম চৌধুরী। এর একমাসের মাথায় ১০ অক্টোবর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পুনর্গঠিত চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হতে থাকে। সবশেষ বাজার বিশ্লেষণে  জানা গেছে, কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৫ টাকা ৩০ পয়সা বা ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।  

নতুন পর্ষদ গঠনের বিষয়ে কোম্পানিটির সেক্রেটারি মাহমুদুর হাসান বাংলাভিশন ডিজিটালকে জানান, এই বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। রেগুলেটর বডি থেকে তথ্য পেলে জানাতে পারবো।

ডিএসই’র ওয়েব সাইডের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৩১ ডিমেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৪৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ।

মন্তব্য করুন: