• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

শিল্প ব্যবসায়ীদের সুদ মওকুফ ৪৮৭৭ কোটি টাকা, এগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

আনোয়ার হোসাইন সোহেল

প্রকাশিত: ১৩:২৬, ৫ এপ্রিল ২০২২

আপডেট: ১৬:১৯, ৫ এপ্রিল ২০২২

ফন্ট সাইজ
শিল্প ব্যবসায়ীদের সুদ মওকুফ ৪৮৭৭ কোটি টাকা, এগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

ফাইল ছবি

করোনামহামারির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতি কাটাতে একাধিক প্রণোদনা প্যাকেজসহ সরকার ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ারপর ব্যাংক মালিক ও পরিচালনা পর্ষদ পরস্পর যোগসাজশে সুদ মওকুফের সুবিধা নিয়েছেন। দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৬১টি ব্যাংক ২০২১ সালেই ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। এ ঋণ মওকুফের তালিকায় পরিমাণের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়াত্ব ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। সোমবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তফসিলভুক্ত ব্যাংকগুলো প্রাণঘাতী মহামারি করোনা শুরু হওয়া ২০২০ সালে মওকুফ করে চার হাজার ৯২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০১৯ সালে মওকুফ করা সুদের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ২০১৮ সালে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা ও ২০১৭ সালে ১ হাজার ৯০০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ব্যাংকগুলো সুদ মওকুফ করেছে ৪ হাজার ৮৭৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মওকুফ করা সুদের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৭০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ১২২ কোটি ১৪ লাখ টাকা, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ১ হাজার ৩৫০ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আর ২০২০ সালে ৪ হাজার ৯২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার মওকুফ করা সুদের মধ্যে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২ হাজার ৯৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ৭০৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ১ হাজার ২১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

আরো দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকার মওকুফকৃত সুদের মধ্যে রাষ্ট্রপরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২ হাজার ২১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ১ হাজার ৪০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ১২ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ৭ অক্টোবর এক নির্দেশনায় জানায়, প্রতিটি ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতিমালার আলোকে সুদ মওকুফ করতে পারবে, তবে আসল মওকুফ করতে পারবে না। আর সহায়ক জামানতের (কোলেটারেল সিকিউরিটি) বাজারমূল্য ঋণের অঙ্কের চেয়ে বেশি হলে সে ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুদ মওকুফ-সুবিধা দেওয়া যাবে না। সে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন মোতাবেক সুদ মওকুফ করে আসছে। কোনো কোনো ব্যাংক শ্রেণিকৃত ঋণের কিংবা মামলাধীন ঋণের স্থগিত সুদের অর্ধেক মওকুফ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থগিত সুদের পুরোটাই মওকুফ করে দেয়।

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা-৪৯ (চ)-তে বলা হয়েছে, ‘ঋণ শৃঙ্খলার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণভাবে সব ব্যাংক-কোম্পানি বা কোনো বিশেষ ব্যাংক-কোম্পানি বা বিশেষ শ্রেণির ব্যাংক-কোম্পানির জন্য ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণ, ঋণ মওকুফ, পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিষয়সমূহে বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয় নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।’ ওই বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯১ সালের ৭ অক্টোবর এক নির্দেশনায় বলে, প্রত্যেক ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতিমালার মধ্যে সুদ মওকুফ করতে পারবে, তবে আসল (প্রিন্সিপাল) মওকুফ করা যাবে না।

এ নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজন মোতাবেক সুদ মওকুফ করে আসছে। কোনো কোনো ব্যাংক শ্রেণিকৃত ঋণের কিংবা মামলাধীন ঋণের স্থগিত সুদের অর্ধেক মওকুফ করে এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্থগিত সুদের পুরোটাই মওকুফ করে। কিছু ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় আয় খাতে আকলিত সুদ মওকুফ করলেও বেশিরভাগ ব্যাংক পারতপক্ষে তা করে না। অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক জামানতের (কোলেটারেল সিকিউরিটি) বাজারমূল্য ঋণের অঙ্কের চেয়ে বেশি হলে সে ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুদ মওকুফ-সুবিধা দেওয়া হয় না।

আবার উচ্চ আদালতে রিটের কারণে ব্যাংকের মামলা যদি বেশ কয়েক বছর যাবৎ নিষ্পত্তি না হয়, শেষ পর্যন্ত গ্রাহক যদি সুদ মওকুফ পেয়ে আসল দিতে রাজি হন, সে ক্ষেত্রে ব্যাংকার মামলার কষ্টের কথা বিবেচনা করে মওকুফ সুবিধা দিতে পারেন। আর যে গ্রাহক নানা প্রতিকূলতার কারণে ঋণ শোধ করতে পারেন না, কিন্তু ব্যাংকের ঋণ শোধে তার আন্তরিকতা আছে বলে মনে হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাংকার তাকে সুদ মওকুফ সুবিধা দিয়ে দায় থেকে রেহাই দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক ব্যবসার মূল উৎস জনগণের আমানত। সাধারণ মানুষ থেকে আমানত সংগ্রহ করে তা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো সুদ অথবা মুনাফা নামে আয় করে। যে কোনো ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে। তবে ১০ শতাংশ শেয়ারধারীই ছড়ি ঘুরান সব সময়। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক সময় আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকাও ফেরত পান না। সুদ মওকুফ সুবিধার কারণে ব্যাংকের নিট আয় এবং আমানতকারীদের সুদ আয় কমে যায়। এতে ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) কম হয়, পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সুদ মওকুফের সুবিধা খুব বেশি পান না। এখানেও প্রভাবশালীদের হাত। এ সুবিধার বেশিরভাগই ভোগ করেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা। এতে আমানতকারীরা লোকসানে পড়েন।

সুদ মওকুফের প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা চলমান থাকলে কোনো অবস্থাতেই ঋণ মওকুফ করা উচিত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যতীত যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠী ঋণের সুদ মওকুফ না পায়, সেদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নজরদারি বাড়াতে হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকের মালিক ও খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ সম্পর্ক দেখা যায়। এছাড়া কিছু ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন কিছু ব্যাক্তি আছেন ও তারাই শিল্পমালিক হিসেবে ঋণ গ্রহণ করেন। এভাবেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের যোগসাজশে বিশেষ গোষ্ঠী সুদ মওকুফের সুবিধা নেয়। যার ফলে অনেক ব্যাংক দুর্বল হচ্ছে।’

২০২০ সালের এপ্রিলে প্রণোদনার আওতায় প্রথমবারের মতো ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। করোনা মহামারি চলাকালে দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। স্বল্প সুদে দেওয়া প্রণোদনার এ ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত সুদের অর্ধেক সরকার পরিশোধ করবে বলে নির্দেশনা দেয়া হয়।

ঘোষণা করা প্রণোদনা প্যাকেজে ৩০ হাজার কোটি টাকা বৃহৎ শিল্প এবং পরিষেবা খাতের জন্য ঘোষণা করা হয়। এদিকে প্রণোদনা ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একাধিক অভিযোগের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রদত্ত ঋণের উপর তদারকি করার নির্দেশ দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। প্রণোদনার ঋণ বিতরণের সময় বেশিরভাগ বড় গ্রুপগুলো তাদের নেওয়া আগের ঋণের সুদ পরিশোধ ও ঋণ সমন্বয়ের বিষয়টি লক্ষ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়াও, প্রণোদনার ঋণ নিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করার বিষয়টিও একাধিক ব্যাংকে পরিদর্শনের সময়ে চোখে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

বিভি/এইচএস

মন্তব্য করুন: