• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৪৭ বছরে ইবির পাঁচ সমাবর্তন, নিজ মেয়াদেই দুবার আয়োজনের চিন্তা বর্তমান ভিসির

তালুকদার হাম্মাদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ১৯:৪৯, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৯:৫১, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
৪৭ বছরে ইবির পাঁচ সমাবর্তন, নিজ মেয়াদেই দুবার আয়োজনের চিন্তা বর্তমান ভিসির

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থেকে প্রতিবছর স্নাতক শেষ করেন প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী। তবে স্নাতক শেষ করেই মূল সনদ হাতে পান না তারা। এতে সাময়িক সনদ দিয়েই মেটাতে হয় প্রয়োজনীয় কাজ। তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্নক্ষেত্রে মূল সনদ না থাকায় জটিলতায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। আর এই মূল সনদ পেতে দীর্ঘ সময় ধরে সমাবর্তনের অপেক্ষা করতে হয় তাদের।

এদিকে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পর ১৯৯৩ সালে প্রথম, ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়, ২০০২ সালে তৃতীয় ও ২০১৮ সালে চতুর্থ সমাবর্তন পায় ইবি শিক্ষার্থীরা। সবশেষ দীর্ঘ ৮ বছর পর ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের বহুল প্রতীক্ষিত পঞ্চম সমাবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। একইসাথে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের বিধান করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে পঞ্চম সমাবর্তনের পর নিজ মেয়াদের মধ্যেই আরেকটি সমাবর্তন করবেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান।

জানা যায়, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছরই সমাবর্তন আয়োজন করা হয়। তবে সেশনজটসহ নানাবিধ জটিলতার কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর এটি আয়োজন করা সম্ভব হয় না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৩ বার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বার এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ বার সমাবর্তন হয়েছে। এদিকে প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে ইবিতে সমাবর্তন হয়েছে মাত্র ৪ বার। এ সমাবর্তনগুলোর আদ্যপান্ত ও শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রত্যাশার বিষয়গুলোই তুলে ধরেছেন বাংলাভিশনের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তালুকদার হাম্মাদ।

প্রথম সমাবর্তন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পর ১৯৯৩ সালের ২৭ এপ্রিল প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিককার ব্যাচসমূহ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকে ওই সমাবর্তনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং অন্যান্য ডিগ্রির মূল সনদপত্র দেওয়া হয়। একইসাথে মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ কৃতি শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। ওই সমাবর্তন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি বিশেষ স্মারক প্রকাশ করা হয়। যার মধ্যে আবুল খায়ের মুহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ এবং মো. রুহুল আমিনের লেখা ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: অতীত ও বর্তমান’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণী অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় সমাবর্তন
১৯৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর শেখ হাসিনা। এসময় পূর্ববর্তী কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং অন্যান্য ডিগ্রির মূল সনদপত্র দেওয়া হয়। এদিকে ২০০২ সালের ২৮ মার্চ তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও চ্যান্সেলর বেগম খালেদা জিয়া। এসময় ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের মূল সনদ ও স্বর্ণপদক দেওয়া হয়েছিল।

চতুর্থ সমাবর্তন
২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির চতুর্থ ও সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর আবদুল হামিদ। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এ সমাবর্তনে ১ হাজার ৬৩৭ জন স্নাতক, ৭ হাজার ৪৮৮ জন স্নাতকোত্তর, ১৩৭ জন এমফিল ও ১১০ জন পিএইচডি ডিগ্রীধারীসহ সর্বমোট ৯ হাজার তিনশ ৭২ জনকে মূল সনদ দেওয়া হয়। একইসাথে মেধা তালিকার শীর্ষের ৮০ জন শিক্ষার্থীকে ‘রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়।

এদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন। আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে এটি অনুষ্ঠিত হবে। গত ১৪ই সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে সাক্ষাৎ শেষে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে। একইসাথে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, বর্তমান প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই যে দীর্ঘ ৯ বছর পর হলেও তারা সমাবর্তনের আয়োজন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার জীবনেই অমূল্য কিছু স্মৃতি তৈরি করে। তবে এগুলোর পাশাপাশি সবারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইচ্ছাটি থাকে তা হলো— দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজের মূল সনদ হাতে পাওয়া। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেটি হয়ে ওঠে না। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সমাবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ জটের এই সংস্কৃতি ভেঙে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি।  

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ৫ম সমাবর্তনের ঘোষণা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। তবে আমরা তেমন আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না এইজন্য যে, সেশনজটের কারণে আমাদের স্নাতক শেষ না হওয়াতে আমরা এই সমাবর্তনে অংশ নিতে পারব না। আগের সংস্কৃতি চলমান থাকলে ৬ষ্ঠ সমাবর্তনের জন্য আমাদেরকে পুনরায় ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাই প্রশাসনের কাছে এই দীর্ঘসূত্রীতার সংস্কৃতি ভেঙে চার বছর পরপর সমাবর্তন আয়েজনের বিধান করার দাবি জানাচ্ছি।

ইবি শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মিজানূর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে সমাবর্তন করার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। তবে সাধারণভাবে এটি প্রতিবছরই হওয়ার কথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সমাবর্তনের নির্দিষ্ট একটি তারিখ থাকে। প্রত্যেক বছর ওই তারিখেই সমাবর্তন হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি বা কোনো মন্ত্রী যায় না। ভাইস চ্যান্সেলরই তাদের মূল সনদ প্রদান করে। তবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজটসহ বিভিন্ন জটিলতার কারনে প্রতিবছর সমাবর্তন করা সম্ভব হয়না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সময় সুযোগ ও সুবিধা অনুযায়ী এটি আয়োজন করে থাকে।

নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, আসলে সমাবর্তন নিয়মিতই হওয়ার কথা। কিন্তু এর সাথে অনেকগুলো বিষয় জড়িত থাকে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন থাকে, বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষা থাকে। এছাড়া এটি আয়োজনে বড় অর্থের প্রয়োজন হয়। একইসাথে প্রস্তুতির জন্য বড় একটি বড় সময় প্রয়োজন হয়। যে কারণে ইচ্ছে থাকলেও যখন তখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে এটি নিয়মিত করা যায় কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা করব। পাশাপাশি এই পঞ্চম সমাবর্তনের পর আমি উপাচার্য থাকাকালীনই আরেকটি সমাবর্তন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। 

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: