প্যাকেটজাত খাদ্যে লুকানো অতিরিক্ত লবণ-চিনি, বছরে ঝরছে ৩ লাখ প্রাণ
ছবি: এআই
আপনি কি ২৫০ মিলিলিটারের একটি কোমল পানীয় পান করেছেন? তাহলে ওই পানীয়তেই আপনার দৈনিক গ্রহণযোগ্য চিনির সীমা প্রায় পূরণ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একজন মানুষের দিনে ২৫ গ্রাম বা প্রায় ছয় চামচের বেশি চিনি গ্রহণ করা ক্ষতিকর। অথচ ২৫০ মিলিলিটারের একটি কোমল পানীয়তেই থাকতে পারে ২৭ গ্রামের বেশি চিনি।
সকালে নুডলস বা পাউরুটি দিয়ে নাশতা করেন অনেকে। নুডলস রান্নায় আলাদা করে লবণ না দিলেও প্যাকেটজাত এই খাবার থেকেই শরীরে চলে যেতে পারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম। প্রতি ১০০ গ্রাম নুডলসে সোডিয়ামের পরিমাণ চার গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। আর প্রতি ১০০ গ্রাম পাউরুটিতে লবণ থাকতে পারে এক থেকে দেড় গ্রাম। অথচ WHO বলছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করা ক্ষতিকর।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এভাবে নিয়মিত অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণের কারণে দেশে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মেহেদী হাসান বাংলাভিশনকে বলেন, লবণ ও চিনি খাবারের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি চিনি দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে স্থূলতা বাড়তে পারে, যা নিজেই নানা রোগের কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। এসব রোগে বছরে প্রায় তিন লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়।
এদিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ নিয়মিত প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করেন। ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের অর্ধেকের বেশি প্যাকেটজাত খাবারে অভ্যস্ত। এসব খাবারের অধিকাংশেই অতিরিক্ত লবণ ও চিনি থাকে। ফলে অনেকেই না জেনেই প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ করছেন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের গবেষক ডা. আহমদ খাইরুল আবরার বলেন, বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বাড়ছে। ৪০ বছর বা তার আগেই অনেক রোগী হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন।
তিনি বলেন, মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করছে এবং প্রসেসড ফুডের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভোক্তারা অনেক সময় জানেনই না তিনি কতটুকু লবণ, চিনি বা চর্বি গ্রহণ করছেন এবং সেই পরিমাণ তার জন্য ক্ষতিকর কি না।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বির বিষয়ে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের (সিএলপিএ) সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট কামরুন্নিসা মুন্না বলেন, একজন ভোক্তা যখন প্যাকেটজাত খাবার কিনছেন, তখন তিনি কতটুকু লবণ ও চিনি গ্রহণ করছেন, তা জানার অধিকার তার রয়েছে। শিল্পখাতেরও এ তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, চিলি, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা চালুর পর ভোক্তাদের খাদ্য গ্রহণের ওপর এর প্রভাব দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের নকশাভিত্তিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা যুক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালায় এফওপিএল (Front-of-Pack Labelling) ডিজাইন সংযোজন করা হয়েছে। এ জন্য নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে পরামর্শ সভা করা হয়েছে। দুটি গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে ডিজাইনটি চূড়ান্ত করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কিছু আবেদন পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী এফওপিএল সংযুক্ত মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালাটি পুনরায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) পাঠানো হবে। সেখানে নির্ধারিত সময় অপেক্ষার পর দ্রুততম সময়ে গেজেট প্রকাশের আশা করা হচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা সংক্রান্ত বিধিমালা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্যের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে দেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
জনস্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রক্রিয়াটি ২০২৩ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে খসড়া তৈরি হওয়ার প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে। জানুয়ারিতে খসড়া প্রকাশিত হলেও এখনো এটি অনুমোদন হয়নি।
তিনি বলেন, শুধু বিধিমালা তৈরি করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকারহীন করা উচিত নয়। তাই বিধিমালাটি দ্রুত অনুমোদন করে কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
বিভি/কেএস/পিএইচ













মন্তব্য করুন: