তিন সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে মজুদ থাকা গম ও ময়দা
ইয়েমেনের তাইজে ভয়াবহ খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা জাতিসংঘের
একদিকে মৃত্যুর ভয়, অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দাম—সব মিলিয়ে ইতিহাসের অন্যতম চরম এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ইয়েমেনের তাইজ শহরের বাসিন্দারা। ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধের হটস্পট খ্যাত একটি এলাকা। তবে সম্প্রতি সেখানে নতুন করে তীব্র সামরিক সংঘাত, প্রবল গোলাবর্ষণ এবং অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
হুথি বাহিনী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষের ফলে তাইজের চারপাশের প্রধান রাস্তাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এডেন ও অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে তাইজের যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রুটগুলো রয়েছে, সেগুলো কাটছাঁট করে শহরকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধী সামরিক শক্তিকে কোনঠাসা করা, কিন্তু এর চরম খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের।
রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের বিকল্প পথ দিয়ে অতিরিক্ত খরচ করে পণ্য আনতে হচ্ছে। আর সেই বাড়তি যাতায়াত খরচের প্রভাব পড়ছে পণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর। নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের পক্ষে এই উচ্চ মূল্যে নিত্যপণ্য কেনা সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। খাবার পানি, রান্নার গ্যাস এবং মৌলিক খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাইজির বাসিন্দা নাশওয়ান সাদ বলেন, ''আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছি যেখানে সাধারণ মানুষ জীবিকার সন্ধানে আছে, কিন্তু যাতায়াতের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। আগে এক বস্তা গমের দাম ছিল ৪২,০০০ রিয়াল। মাত্র তিনি দিনের ব্যবধানে ১৮,০০০ রিয়াল বেড়ে এখন দাম পৌঁছেছে ৬০,০০০ রিয়ালে। আমরা এমন সব পরিবারের কথা জানি যারা তাদের নিত্যদিনের খাবারটুকুও জোগাড় করতে পারছে না। নারীরা কাঁদছেন; সন্তানদের খাওয়ানোর মতো কিছুই তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। আমরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি যেন তারা নাগরিকদের জীবিকার ব্যবস্থা করে।''
স্কুল বন্ধ হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জামিল আল মুসাদি বলেন, ''সামরিক অভিযান যদি এভাবে চলতেই থাকে, তবে সাধারণ মানুষের ওপর যেন কোনো মানবিক সংকট বা অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া না হয়। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী ও নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া উচিৎ। এছাড়া কিছু এলাকায় সরকার ও হুথি মিলিশিয়াদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের ফলে স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা কার্যক্রম, বিশেষ করে স্কুলশিক্ষার্থী ও শিশুদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।"
এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, অবরোধ ও সংঘাতের কারণে শহরটিতে যেভাবে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, তাতে মজুদ থাকা গম ও ময়দা আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফানি দুজারিক বলেন, ''ইয়েমেন ও সৌদি আরবে চলমান সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা বিভিন্ন ফ্রন্টলাইনে—বিশেষ করে তাইজ এলাকায়—তীব্র সংঘাত নিয়েও শঙ্কিত; যেমনটা আমরা আগেই জানিয়েছি, এর ফলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিপর্যয়কর মানবিক প্রভাব পড়ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি সংযম প্রদর্শনের এবং উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি রোধ করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা তাদের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে নিজেদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার এবং বেসামরিক নাগরিক ও তাদের ব্যবহৃত অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছি; একইসাথে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষায় সর্বদা সতর্ক থাকার জন্যও তাগিদ দিচ্ছি। আমরা বারবার বলে আসছি—এবং কেবল আমরাই নই, আরও অনেকেই বলছেন—যে এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই। আমরা সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই যেন তারা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের পথ খুঁজে বের করে।''
তীব্র গোলাবর্ষণ এবং সরাসরি স্থলযুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। আগস্টের শুরু থেকে সারা দেশে ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে; এর মধ্যে কেবল তাইজ থেকেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে দেড় লাখের বেশি মানুষ। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্প ও পরিত্যক্ত স্কুলে গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়েছে। এসব ক্যাম্পে খাবার পানি, স্যানিটেশন ও মৌলিক ওষুধের চরম অভাব রয়েছে। গৃহহীন হওয়া লাখো মানুষ এখন এক অনিশ্চিত ও ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
বিভি/এমএফআর













মন্তব্য করুন: