যুদ্ধ বন্ধসহ ৫ শর্ত দিলো ইরান, মধ্যস্থতায় এবার কাতার
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় পাঁচটি শর্ত দিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি জানিয়েছেন, এসব শর্ত পূরণ হলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে লেবানন ও গাজাসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে আলজাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের পাঁচ শর্তের মধ্যে প্রথমটি হলো লেবানন ও গাজাসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়া। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
চতুর্থ শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি চেয়েছে তেহরান। পঞ্চমত, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা দাবি করেছে দেশটি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে কাতার। দেশটির দাবি, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।
মঙ্গলবার দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, সোমবার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক করেছে। একই দিন সন্ধ্যায় প্রতিনিধিদলটি দোহায় ফিরে আসে।
তিনি বলেন, কাতারের দেওয়া প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ পর্যালোচনা করছে। মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করছেন। সমঝোতার সম্ভাবনা না থাকলে আলোচনা অব্যাহত থাকত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সমঝোতা হবে, নাকি সামরিক উত্তেজনা বাড়বে, সে বিষয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করতে চাননি কাতারের এই মুখপাত্র। তার ভাষ্য, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা কিংবা জাহাজে আক্রমণ—যেকোনো ধরনের উত্তেজনা চলমান আলোচনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সমঝোতার পথ তৈরির চেষ্টা কাতারের
তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক রেসুল সারদার আতাস জানান, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে কাতার। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠির পর কাতারের প্রতিনিধিদল ইরান সফর করে। পরে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলও কাতার সফর করে।
আতাসের মতে, কাতার এখনই চূড়ান্ত কোনো শান্তিচুক্তির চেষ্টা করছে না। বরং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরুর জন্য একটি কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে।
দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসই আলোচনার প্রধান বাধা। ইরানের অভিযোগ, এর আগে দুইবার কূটনৈতিক আলোচনা চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ কারণে এবার আলোচনার আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, আটকে থাকা সম্পদ ফেরত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করার মতো বাস্তব পদক্ষেপ চায় তেহরান।
কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সোমবার ইরানের কেশম দ্বীপে সীমিত আকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান একটি মার্কিন উড়োজাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেছিল। ওই হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ধ্বংস করতেই পাল্টা আঘাত হানা হয়।
তবে এটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত নয় বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। একজন মার্কিন কর্মকর্তা হামলাটিকে মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর আসা হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ জানিয়েছে, কেশম দ্বীপে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পাশের বন্দর লেঙ্গেহ শহরেও কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।
এর আগে ৮ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না।
তিন মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের
এদিকে মঙ্গলবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কেশম দ্বীপের দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এমকিউএম-১৭০ গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বাহিনীটির দাবি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন দুটি অকার্যকর করা হয়।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পূর্ব দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করার দাবিও করেছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইরানের ভূপাতিত করা ৫৫তম মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন। সূত্র: আল-জাজিরা।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: