সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে সরকার : টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সংস্কারের নামে যতটুকুই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কেন এই আত্মসমর্পণ হলো, দুর্বলতা কোথায়, তা মূল প্রশ্ন। তবে, সরকারের অভ্যন্তরে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকায় এর নির্দিষ্ট উত্তর আমার কাছে নেই।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিষয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘সংস্কারের জন্য খাত বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, এমন বিবেচনার সুযোগ নেই। ১১টি কমিশন ও কমিটিসমূহের বাইরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্য অনেক খাত, যেমন শিক্ষা, কৃষি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত কোন যুক্তিতে বাদ পড়েছে, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসমূহ বাস্তবায়নের কোনো কর্মকৌশল প্রণীত হয়নি। শুরু থেকে কোনো পর্যায়ে সংস্কার বিরোধী মহলকে চিহ্নিত করে প্রতিহত করার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়নি। বরং, এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল হয়েছে। সংস্কার-পরিপন্থী অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে নেতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংস্কার-পরি আইন বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।’
সেখানে আরও বলা হয়, সবগুলো সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারীবিষয়ক, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর শ্বেতপত্রের সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্পর্কে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সরকার একতরফাভাবে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য লোক দেখানোভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায় দায় এড়ানো হয়েছে, অবহেলিত হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো অংশীজনদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হয়েছে। সরকার আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চার উদহারণ সৃষ্টি করতে পারেনি।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ যেভাবে প্রণীত হয়েছে, তাতে এর স্বাধীন পুলিশ কমিশনের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে। লোক-দেখানো এ অধ্যাদেশে এমন অনেক উপদান রয়েছে যাতে তথাকথিত পুলিশ কমিশন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের ক্ষমতার অব্যাহত অপব্যবহারের রিসোর্ট ছাড়াকিছুই হবে না। বাস্তবে এটি পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
টিআইবি বলেছে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি আন্তর্জাতিক মানের আইন হিসেবে পরিগণিত হতে পারত, যদি খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় যেসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সম্পৃক্ত করা হয়েছিল, তাদের অন্ধকারে রেখে অন্তর্ঘাতী প্রক্রিয়ায় এতে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অপ্রতিরোধ্য সুযোগ সৃষ্টি না করা হতো।
সরকারের প্রায় গত দেড় বছরের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ নামে কর্তৃপক্ষ থাকলেও বাস্তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখানে নেওয়া হয় না। কোন কাগজে সই হবে, কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, কোন ধারা বা তারিখ থাকবে কিংবা বাদ যাবে, এসব বিষয় উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না। এসব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা অত্যন্ত ক্ষমতাবান কিছু ব্যক্তি বা মহলের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এই মহলগুলো শুধু নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থই নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থ এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একাংশের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সংস্থাটিকে কার্যকর করার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত অঙ্গীকার দেখা যায় না। দুদক যদি বাস্তব অর্থে সামান্য হলেও কার্যকর হয়, তাহলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, একপর্যায়ে সংস্কার কমিশন গঠনের প্রাথমিক সময়ে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলো সবাই সংস্কার চায়। তেমনি বিরোধী শক্তিও রয়েছে। এই প্রতিকূলতাগুলো ম্যাপিং করে বিশ্লেষণ ও প্রতিরোধের কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ দেখিনি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে হোক বা সক্ষমতার অভাবে হোক, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর যে বাস্তবতা দেখছি, সেটি সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান প্রমুখ।
বিভি/পিএইচ




মন্তব্য করুন: