জীবাশ্ম জ্বালানিবিরোধী ও নবায়নযোগ্য শক্তিবান্ধব বাজেটে উচ্ছ্বসিত পরিবেশ অঙ্গন
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোল চালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান (EV) ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে ব্যাতিক্রমী কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সকল ধরনের ইলেকট্রিক যানে (EV) শুল্ক কমিয়ে উল্টে বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ইন্টারনাল কম্বাশন (IC)গাড়ির ক্ষেত্রে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠন ও জীবাশ্মজ্বালানি বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় এই তথ্য জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জ্বালানী নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অনুরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সমুদয় শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস-ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ব্যতীত সমুদয় শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ি ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV) আমদানিতে শুল্ক হ্রাস
একই ভাবে, নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV)-এর ক্ষেত্রে ২০০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতা সম্পন্ন গাড়ি আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক গাড়ির ধরণভেদে হ্রাস করার এবং ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন গাড়ি আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
এর ফলে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ হতে হ্রাস হয়ে ৭৩.৪৩৭ শতাংশ হবে এবং ২০০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ হতে হ্রাস পেয়ে ৯৬.১০ শতাংশ হবে বলেও বাজেট বক্তৃতায় জানান অর্থমন্ত্রী।
শুধু ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) আমদানিতেই সুবিধা প্রদান নয়, বরং এর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিতে দেশব্যাপী চার্জিং নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়ারও বিষয়টিও ভেবেছে সরকার। তাই পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার এবং চার্জিং স্টেশন আমদানি পর্যায়ে মোট করভার ৩৯.৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
অপরদিকে কর বাড়ানো হয়েছে জীবষ্ম জ্বালানি ভিত্তিক পরিবহনগুলোর ক্ষেত্রে। অর্থমন্ত্রী তার তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, মধ্যম সারির ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন (IC) ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানিকৃত গাড়ির ওপর বিদ্যমান সামগ্রিক করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। তবে অন্যান্য গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করভার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করছি।
এদিকে নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ উৎস সৌর
বিদ্যুৎখাতের প্রসারের জন্য এই খাত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণসমূহ আমদানিতে প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূণ্য শতাংশ করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এই খাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের স্বার্থে এই প্রজ্ঞাপনটি ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
তবে এই খাত সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যসমূহের রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০২৮ খ্রিস্টাব্দের পর প্রত্যাহার করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে দেশীয় ই-বাইক উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নিয়োজিত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকেও উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এছাড়াও দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আগামি ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত এসকল পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারিরও প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
জীবাশ্ম জ্বালানির বিপরীতে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে জেটনেট বিডি নামের একশনএইড বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন একটি জোট। এই জোটের সমন্বয়ক ও একশনএইড বাংলাদেশের ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর' টিমের ম্যানেজার মো. আবুল কালাম আজাদ বাংলাভিশনকে বলেন, এটি সরকারের একটি অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। একটি নতুন সরকার এত দ্রুত সময়ে এত বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস করবে আমরাও ভাবিনি। এই বাজেট ঘোষণার মধ্যেদিয়ে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের যাত্রা শুরু হলো। আমরা মনে করছি, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে যেমন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের দায় থেকে মুক্তি পাবে অপরদিকে আমাদের জ্বালানি নির্ভরতাও কমে আসবে। বাজেটের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানি রূপান্তর সফল হলে আমরা ধিরে ধিরে জ্বালানি স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারবো।
তিনি আরও বলেন, মাত্রতো প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা হলো। দেখা যাক গেজেট পর্যন্ত কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। তবে শুধু বাজেটে নবায়নযোগ্য শক্তিকে উৎসাহিত করলে হবে না, মানসম্মত প্রযুক্তি আমদানিতেও সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশাবাদী এবং এই পদক্ষেপকে শুভ কামনা জানাই।
এ বিষয়ে তরুণ নেতৃত্বাধীন পরিবেশবাদী সংগঠন মিশন গ্রিন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, সরকারের আজকের এই পদক্ষেপ আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মের জন্য আগামীর সবুজ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। আমরা সরকারকে এই পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই এবং মনেপ্রাণে এই পদক্ষেপের সফলতা কামনা করি।
পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ধরীত্রি রক্ষায় আমরা (ধরা)র সদস্য সচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, এই বাজেটকে কম্প্রিহ্যান্সিভ এনালাইসিস করার সময় এখনো হয়নি। তবে আপাতদৃষ্টিতে আমরা প্রথমিকভাবে যা দেখছি তাতে সরকার এবারের বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনা করে নানান পদক্ষেপ নিয়েছে দেখছি। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানিকে নিরুৎসাহিত করে নবায়নযোগ্য শক্তিকে যেভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে এটিকে আমরা পরিবেশকর্মী হিসেবে সাধুবাদ জানাই। তবে এই বাজেট কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, কারা এর সুবিধাভোগী হবে, তৃণমূল জনগোষ্ঠী বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তরা এর দ্বারা কতটুকু উপকৃত হবেন সেটি দেখার বিষয়। আমরা জানি না সরকার এই সিদ্ধান্ত কতটা বিজ্ঞানভিত্তিক যাচাই করে নিয়েছে। আমরা চাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিবে সেগুলো যেন বিজ্ঞানভিত্তিক এবং বাস্তবতার বিবেচনায় হয়। একইসঙ্গে এখানকার যে কোনো পদক্ষেপে যেন সুশাসন নিশ্চিত করা হয়।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: