• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব

‘কবর বিলীন আতঙ্কে কাঠের বাক্সে লাশ দাফন করছে নোয়াখালীর উপকূলবাসী’

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:৫১, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
‘কবর বিলীন আতঙ্কে কাঠের বাক্সে লাশ দাফন করছে নোয়াখালীর উপকূলবাসী’

নোয়াখালীর হাতিয়ায় উপকূলীয় ভাঙনে বিলীন হতে যাওয়া বাবার কবরে শেষ জিয়ারত করছেন ছেলে। ছবি: ডা. ইমরান পারভেজ

উপকূলের ভাঙনে অর্ধেক ভেঙে গেছে বাবার কবর। চোখের সামনেই হয়তো বিলীন হয়ে যাবে পুরো কবরটি। তাই শেষ মুহূর্তে বাবার স্মৃতিবিজড়িত কবরটি জিয়ারত করছিলেন সন্তান। সম্প্রতি পুরস্কার জয়ের পর বাংলাভিশনে ছবিটি প্রকাশ হলে তা ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়। ছবি নিয়ে চলে নানান আলোচনা-সমালোচনাও। প্রশ্ন ওঠে, অর্ধেক ভেঙে যাওয়া কবরে কাঠ বেরিয়ে থাকার বিষয়ে।

ছবিটির গল্প নিয়ে বাংলাভিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ। কবরে কাঠ থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ছবি তোলার পর জিয়ারতকারী সেই যুবককে কবরটি কার জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, এটি তার বাবার কবর। যেভাবে ভাঙন চলছে, কবরটিতো বেশিক্ষণ টিকবে না, তুমি এখন কি করবে? জানতে চাইলে সে জানায়, এভাবে ভাঙনের কবলে পড়তে পারে সেই আতঙ্কে আগেই তারা তার বাবাকে কাঠের কফিনসহ দাফন করেছেন। ওই এলাকায় অনেকেই এভাবে দাফন করে, পরে ভাঙনে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হলে কফিনসহ তুলে অন্যত্র নিয়ে আবার দাফন করা হয়। সেও জানিয়েছে, সেদিন জুমার নামাজের পর তার বাবার কবরটি অন্যত্র নিয়ে দাফন করা হবে।’

ডা. ইমরান পারভেজ আরও বলেন, ‘ওই ছেলেটি তাকে জানিয়েছেন, সেই সময় মাত্র ৩-৪ মাসে নদী ভাঙনে ওই এলাকার অন্তত আধা কিলোমিটার ভেঙে বিলীন হয়েছে। যার কারণে তারা তাদের পৈত্রিকভিটা হারিয়ে ঘরবাড়ি অন্যত্র স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন। সেটি জনতাঘাট (ভাঙনের কবলে থাকা কবরের স্থান) থেকে আরও ৪-৫ কিলোমিটার দূরে। কবরটাও স্থানান্তর করে সেখানেই নিয়ে যাওয়া হবে।’

নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার ওই এলাকার (জনতা ঘাট) ভাঙনের ভয়াবহতার চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে আলোকচিত্রী ইমরান পারভেজ বলেন, এই কবরটিই একা নয়, ওখানে একটি মসজিদ ছিল, তার পাশে কবরস্থান ছিল। একটি স্কুল ছিল, ইউনিয়ন পরিষদ ছিল। সেগুলো সব বিলীন হয়ে গেছে।’

দেশের বিভিন্ন এলাকার ছবি তোলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ইমরান পারভেজ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতার কারণে শুধু নোয়াখালীর এই জনতা ঘাট না, বাংলাদেশের সব উপকূলেই চরম ভাঙন হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ এতে বাস্তুহারা হচ্ছেন। যা বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে তার ক্যামেরার ক্লিকে।’

ইমরান পারভেজের তোলা এই ছবিটি বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিগুলোর অন্যতম একটি বলে মনে করেন দেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রতিবছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা হয় জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে। যদিও আশ্বাসের বাইরে সেই আলোচনায়ও মেলেনি উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন। ক্ষতিপূরণ পেলে হয়তো বাড়িঘর সংস্কার করা যায় কিন্তু পূর্বসূরির কবর বা শেষ স্মৃতিচিহ্ন হারানোর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি কখনো অর্থ দিয়ে কাটানো সম্ভব নয়।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বাংলাভিশনকে বলেন, এই ছবিটি আমাদের আরেকটি নতুন পরিস্থিতির চিত্র দেখালো। আগে জানতাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষ উদ্বাস্তূ হচ্ছে। বসতভিটা স্থানান্তর হচ্ছে। কিন্তু কবরও যে মাইগ্রেট করছে এটা আমাদের জন্য নতুন শিক্ষা। এভাবে জলবায়ু পরিবর্তন যে কতভাবে আমাদের ক্ষতি করছে, সব হয়তো বর্ণনা করেও শেষ করা যাবে না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময় জলবায়ু পরিবর্তনে সম্পদের ক্ষতির বিবেচনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব করি। কিন্তু এই যে বাবার কবর হারানোর মতো মনস্তাত্মিক ক্ষতি যে কি পরিমান সেটা আমরা হিসাব করি না। করবোই-বা কীভাবে? বাবার স্মৃতি হারানোর শূন্যতা কি কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব?’

নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (NACOM)-এর নির্বাহী পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন হারানোয় তার যে মানসিক ক্ষতি এটা আপনি কখনোই টাকা দিয়ে পূরণ করতে পারবেন না। এটা কোনোভাবে সম্ভব না। 

তিনি বলেন, ‘আমরা যে প্রতিবছর ঝড়, বন্যা, খরা, নদী/সমুদ্রে ভাঙন, তাপপ্রবাহসহ নানান দুর্যোগে ভুগছি তার অন্যতম প্রধান কারণ উন্নত বিশ্বের গ্রিনহাউস নিঃসরণ। কিন্তু আমরা বাংলাদেশ বা আমাদের মতো উন্নয়নশীল যে রাষ্ট্রগুলো আছে তারাতো গ্রিনহাউস নিঃসরণে দায়ী নয়। আমরা যা নিঃসরণ করি তা খুবই সামান্য। আমরা যদি কালকে জিরো ইমিশনও করি তাতে বিশ্বের কোনো উন্নতি হবে না। ইমিশন কমাতে হবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে। দায়ী রাষ্ট্রগুলো আমাদের যে ক্ষতি করছে তারা যদি তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দিতো তাহলে আমরাতো হয়তো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকাতে পারতাম। তাহলেতো আর এই বাবার স্মৃতিচিহ্ন হারানোর প্রশ্ন আসতোই না। কিন্তু তারাতো সেটা করছে না।’ 

এই জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী যে ক্ষতি সেটা কাটাতে প্রয়োজন ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আপনি মাত্র ৭০০ বা ৮০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আপনি ২০ মিলিয়ন দিবেন এখন তারপরে আবার টাকা আসলে দিবেন এগুলো উন্নত রাষ্ট্রগুলোর একধরনের তামাশা। ক্ষতি যেভাবে বেড়েই চলেছে এখন জরুরি প্রয়োজন, ফসিল ফুয়েল ফেস আউট। তারপর যে ক্ষতি হয়েছে সেটা কাটানোর জন্য ফান্ড দেওয়া। সমস্যার মূলে সমাধান না করে আপনি ফান্ড দিয়েও কোনো সমাধান করতে পারবেন না।’ 

আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন। বাংলাদেশের তরুণ জলবায়ু কর্মীরা বলছেন, এই সম্মেলনেই আসা উচিত জীবাষ্ম জ্বালানি ফেস আউটের ঘোষণা। 

জলবায়ু নিয়ে কাজ করা তরুণ নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ব্রাইটার্স এর ফাউন্ডার অ্যান্ড ডিরেক্টর সাইদুর রহমান সিয়াম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের যা ক্ষতি হচ্ছে তা কত ফান্ড দিয়ে সমাধান করা যাবে? বার বার ক্ষতি হবে, তারপর চেয়ে চেয়ে ফান্ড নিবো, সমাধান করবো, আবার ক্ষতি হবে-এটাতো সমাধান হতে পারে না। আমরা চাই সমস্যার মূলে সমাধান হোক। তাই এখনি জীবাষ্ম জ্বালানি থেকে ফিরে আসার উচিত। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরেরও সিদ্ধান্ত আসুক এখনই।’

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত