ফিরে আসুন আপসহীনা
মনটা আজ বেজায় খারাপ দু'জন মমতাময়ী মায়ের জন্য। এঁদের প্রথমজন আমার জন্মদাতা মা, দ্বিতীয়জন বাংলার মা। আমার মা কর্কট বা ক্যান্সারের ভুক্তভোগী, কেমোথেরাপি চলছে যথারীতি। বিষয়টি ব্যক্তিগতই থাকুক। কিন্তু দ্বিতীয় বিষয়টি একেবারেই জাতীয়, সমগ্র বাংলাদেশের। গণতন্ত্রের মা, বাংলার আবেগ ও জননন্দিত রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আজ বড়ই সংকটপূর্ণ। বয়সের কারণে উঁনার শরীরে নানাবিধ রোগ দানা বেঁধেছে। দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন উঁনার শরীরে ফুসফুস ও কিডনিতে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে। উঁনি সিসিইউতে আছেন বিশেষজ্ঞ টিমের নিবিড় তত্ত্বাবধানে। আজ উঁনাকে নিয়েই এই লেখা।
অকুতোভয়, অবিসংবাদিত, আপসহীন, মানবিক, দেশপ্রেমিক — এসব বিশেষণ বা সুপারলেটিভস্ বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ও রাজনীতিতে শুধু একজনের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শান্তি-শৃঙ্খলা, আশা-ভরসার প্রতীক তিনি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে অনন্যা তিনি, প্রতিবাদী এক নারী। রাজনীতির বাতিঘর, রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, ভাঙনের বিরুদ্ধে তিনি ঐকের তান। তিনি রূপসী বাংলার জননী, তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা ও উন্নয়নের রূপকার। তিনি বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি এদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অভিভাবক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য সহধর্মিনী, তারেক রহমান ও অকালপ্রয়াত আরাফাত রহমানের মাতা।
গুরুতর অসুস্থ জিয়া পরিবারের বেগম রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি। উঁনি আজ জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে। তাই দলীয় নেতা-কর্মী কাঁদছে, আপামর জনসাধারণ কাঁদছে। কাঁদছে সমগ্র বাংলাদেশ। পড়া হচ্ছে দোয়া-দরূদ ও কোরানখানি। রোগমুক্তি কামনায় হচ্ছে মসজিদে, মন্দিরে, গির্জায় কিংবা প্যাগোডায় ধর্মীয় আচার। এতিমখানা, অনাথাশ্রম, বৃদ্ধাশ্রমে চলছে খাবার বিতরণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে মাতম। কমপক্ষে একজন নারীকে দেখলাম আহাজারী করছে দেশনেত্রী বেগম জিয়ার জন্য। প্রয়োজনে নিজের শরীরের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ওই নারী বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য দান করতে সদা প্রস্তুত। আহা, এমন ত্যাগের বাসনা দেখে মনটাই ভরে গেল।
অমন ত্যাগী মানুষের বিলাপ, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীর দোয়া নিশ্চয়ই কবুল ও মঞ্জুর করবেন দোজাহানের মালিক খোদা। মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করে এটিকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, জাতীয় রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় সংকটকালীন মুহূর্তের রাজপথের লড়াকু সৈনিক অথবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে আর্তমানবতার প্রতিচ্ছবি খালেদা জিয়ার জন্য অমন আর্তনাদ মহান আল্লাহ নিশ্চয়ই শুনবেন এমনটাই বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি প্রাক্তন এই ফার্স্ট লেডি ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী দ্রুতই রোগমুক্তি লাভ করে আবারও জনতার ডাকে সাড়া দিবেন।
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উঁনার চিকিৎসা চলছে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের সমন্বয়ে চলছে রোগ নিরুপণ ও স্বাস্থ্যসেবা। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং উঁনার সহধর্মিনী ও বিশিষ্ট কার্ডিওলোজিস্ট জোবাইদা রহমান চিকিৎসার সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর ও তত্ত্বাবধান করছেন। প্রচণ্ড কষ্ট লাগে যখন ভাবি, মায়ের পাশে ছেলে অনুপস্থিতি। দলের কাণ্ডারি তারেক রহমানের গতকাল শনিবারের সোশ্যাল মিডিয়ার বিবৃতিটা পরে যারপরনাই মনোপীড়ায় ভুগছি। উঁনার এই মনোবেদনার শেষ কোথায়? এর দাওয়াই বা সমাধান কে দেবে — ইউনূস সরকার, মিলিটারি এস্টাব্লিশমেন্ট, জাতীয় রাজনীতি নাকি জনগণ? সবকিছু শেষ হয়ে গেলেই তবে মুক্তি?
ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালে তথাকথিত মিথ্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া বিগত আওয়ামী পতিত সরকারের অবৈধ শাসনামলে বারবার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য আবেদন করেও যেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এসময় উঁনাকে "স্লো পয়জন" দেয়ারও অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু উঁনি ছিলেন দুর্বার, দুর্বিনীত। অন্যায়ের কাছে কখনই মাথা নোয়াননি। অবশেষে এলো ৩৬ জুলাই গণবিপ্লব। এলো চব্বিশের ৫ আগস্ট। গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেলেন সেদিন রাতেই। পেলেন চলাফেরার পূর্ণ স্বাধীনতা। গেলেন লন্ডনে, ছেলের কাছে। চার মাসের চিকিৎসা শেষে আপন নীড়ে ফিরলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যা পিছু ছাড়ছে না। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এই নবযাত্রায় আপনাকে প্রয়োজন। সামনে জাতীয় নির্বাচন। অমিত সম্ভাবনার হাতছানি দিয়ে বাংলাদেশ ডাকছে আপনাকে। আপনি ফিরে আসুন, প্লিজ।
আপনার আশু ও সম্পূর্ণ রোগমুক্তি কামনা করি। সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আপনি রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করুন, দল ও দেশের জন্য আবারও নিজেকে সমর্পণ করুন, দেশ ও জনগণের মঙ্গলে আত্মনিয়োগ করুন। একজন সুস্থ ধারার বিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে আপনি সুপ্রতিষ্ঠিত। আপনার কথা ও কাজে এদেশের মানুষ অনুপ্রাণিত। আপনি পরার্থপরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুন। দেশে বহমান থাকুক সত্যিকারের সুশাসন, শান্তি ও শৃঙ্খলা। রেখে যান ক্ষুধা, দারিদ্র, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ।
পরিশেষে, দুই মায়ের জন্যই আশীর্বাদ চাই যাতে উঁনাদের সকল ব্যাধির নিরাময় হয়ে আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত হয়।
লেখক: এম আমিনুল ইসলাম, জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ও বগুড়া মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটির যুগ্ম-সম্পাদক।
ইমেইল: maislam.rose@gmail.com)
বিভি/টিটি




মন্তব্য করুন: