‘আমরা সবাই ট্রাম্প, আমাদের এই নীতিহীন রাজত্বে’
ছবি: মুহাম্মদ আবু সাঈদ
ট্রাম্পকে নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। সেটা সপ্তাহজুড়ে এবং সারা বিশ্বেই। গতকালের খবরটা বেশ চমকে ওঠার মতো। কারণ, ট্রাম্প তার নৈতিক অবস্থান জানান দিয়েছেন বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেছেন, তার কর্মকান্ডগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে তার ‘নিজস্ব নৈতিকতা’। তিনি এও বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই আমার। আমি মানুষের ক্ষতি করতে চাই না।’
নিউইয়র্কেরই একটি ঘটনা। সময়টা ১৯৩১ সালের ৭ মে। আমেরিকান এক লেখকের বইয়ের শুরুটাই হয়েছে এ ঘটনা দিয়ে। দেখা গেল, একটি ভবনের চারদিক কয়েকশ’ পুলিশ ঘিরে রেখেছে, আর ওই ভবনে আছেন ‘টু-গান ক্রোলি’। ক্রোলি এক ব্যক্তির নাম। ‘টু-গান ক্রোলি’ মানে হতে পারে দুই বন্দুকওয়ালা বা দুই বন্দুকবাজ ক্রোলি। তার কাছে সবসময় দুটি বন্দুক থাকতো বলেই হয়তো এরকম নামকরণ। তাকে গ্রেফতার করার জন্যই সেই অভিযান। আশপাশে হাজারো উৎসুক জনতা। ঘণ্টাখানেকের অভিযানে তাকে গ্রেফতারের পর তার ঘরে জনগণকে উদ্দেশ করে লেখা একটা চিঠি পাওয়া যায়। তাতে যা লেখা ছিল তার বাংলা অর্থ অনেকটা এরকম- ‘আমার কোটের নিচে রয়েছে এক ক্লান্ত, অথচ দয়ালু হৃদয়; যে হৃদয় কারো ক্ষতি করে না।’ মূলত গ্রেফতার অভিযানের কিছু-আগেই ঘটেছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। ক্রোলি গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন, তাকে পুলিশ আটকিয়ে লাইসেন্স দেখতে চায়। আটকানোর সাথে সাথেই গাড়ি থেকে নেমে ক্রোলি ওই পুলিশকে গুলি করে মেরে ফেলে। পুলিশের ‘অপরাধ’ হলো লাইসেন্স চাওয়া। এরকম ঘটনা যে-ক্রোলি ঘটাতে পারেন, সেই ক্রোলিই কি না বললেন, তার দয়ালু হৃদয় রয়েছে, যে হৃদয় কারো ক্ষতি করে না! সেই ঘটনার প্রায় শত বছর পর সেই দেশের প্রেসিডেন্ট ভিনদেশের এক প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে আসার পরও একই রকম কথা বললেন, ‘আই অ্যাম নট লুকিং টু হার্ট পিপল- আমি কারো ক্ষতি করতে চাই না।’
নিজস্ব স্বার্থে ‘নিজস্ব খামারে’ উদ্ভাবিত নীতি-নৈতিকতার বাণী মেনে চলার ইতিহাস নতুন কিছু নয়। সবসময়ই কিছু মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। দু’হাজার বছর আগে লিখিত মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায়ের একটি শ্লোকে বলা আছে, ‘কারুকান শিল্পিনশ্চৈব শূদ্রাংশ্চাত্মোপজীবিনঃ/ একৈকং কারয়েৎ কর্ম মাসি মাসি মহীপতিঃ।’ অর্থ এরকম- খেটে খাওয়া বিভিন্ন পেশার মানুষ যারা কর দিতে পারে না, তারা মাসে একদিন বিনা মজুরিতে রাজার কাজ করে দেবে। ওই একটা দিন কাজ না করে দিলে রাজার কোনো ক্ষতিই হতো না। কিন্তু তিনি সেটা করতেন। এটা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার। আমাদের সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লক্ষ্মণ রেখা অতিক্রম করে সীতা চলে আসলে রাবণ তাকে অপহরণ করে নিয়ে চলে যান; যে জিউসকে টাইটান যুদ্ধে জয়ের জন্য টাইটান হয়েও প্রমিথিউস সাহায্য করেছিলেন, সেই জিউসের কাছ থেকেই প্রমিথিউস পেয়েছিলেন অদ্ভূত ও কঠোর শাস্তি। পুরান, লিজেন্ড, ফোকলোর, ফেয়ারি টেল বা ইতিহাস- সবখানেই আমরা এরকম ক্ষমতার অপব্যবহার হতে দেখেছি। সবাই ততটুকুই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে যতটুকু করলে কেউ তার ক্ষতি করতে পারবে না বলে তার ধারণা। সম্প্রতি আমরা দেখেছি, সংঘবদ্ধ হয়ে অন্যায় কিছু বাস্তবায়ন করা, কবর থেকে ‘ক্ষমতাহীন’ লাশ তুলে সেটাকে ‘ক্ষমতাবান’ কর্তৃক পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা। এই ‘ক্ষমতাবানরা’ মনে করেছে যে, এটাই তাদের ‘নৈতিকতা’ এবং এটাই করা উচিত।
আমরা যদি নিজেকেসহ আশপাশে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো আমাদের অনেকেই কোনো-না-কোনোভাবে আমাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছি। সেটা কথাবার্তা, আচরণ বা কাজ- যে ফরমেটেই হোক না কেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের সামনে একদিনের ঘটনা। রাত তখন দেড়টা। বন্ধু সুজন মাহমুদ, ছোটভাই নাজিব বেগ ও জনিসহ রাস্তার মাঝখানের বড় আইল্যান্ডের মাঝে বসে আছি। হঠাৎ দেখি উচ্চস্বরে কান্না করতে করতে এক রিকশাওয়ালা আসছেন। বয়স ৪০-এর মতো। কারণ হিসেবে জানা গেল, এক ভদ্রলোক (!) তার রিকশায় ঘণ্টাখানেক ঘুরে ‘ভাড়া দিচ্ছে বলে’ নীলক্ষেতে নেমে কোথায় যে গেল আর ফিরে আসেনি।
আমরা এখন অবাক হচ্ছি, ট্রাম্প কীভাবে এমন কাজ করলো! কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ অবাক হয়, সরকারি চাকরিজীবী বেতন পাওয়ার পরও কীভাবে তার ঘামেভেজা ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিতে পারে! ১০ বছর বয়সি ছোট্ট কাজের মেয়ে অবাক হয়, কীভাবে তার গৃহকর্ত্রী গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিতে পারে তার কোমল শরীরে! সেই রিকশাওয়ালা ভাইটি অবাক হয়েছে, মানুষ কীভাবে রক্ত-পানি-করা টাকা মেরে দিতে পারে এক নিমিষে! সবাই নিজ-নিজ অবস্থান থেকেই তার ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছে। ট্রাম্প তার পর্যায়ের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আমরা ট্রাম্পের আচরণ দেখে হয়তো রূপকথার গল্প স্মরণ করছি। ট্রাম্প জানেন যে, তিনি যদি মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসেন তাহলে কেউ তার কিছু করতে পারবে না। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের যদি সেই ক্ষমতা থাকতো, তাহলে তারাও সেটি করতেন কি না সেটাই ভাবার বিষয়। আমাদের দেশে চরদখল, জমিদখল, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধভাবে ক্ষমতাদখল- সবকিছুই হয়ে থাকে প্রত্যেকের ‘ধারণাগত সীমা’ অনুযায়ী।
আমরা আসলে সবাই চশমা ব্যবহার করছি, কিন্তু আয়না ব্যবহার করছি না। সমস্যাটা এখানেই। আমাদের অনেকেই যেন একেকটা ‘ট্রাম্প’। সক্ষমতার সাথে ‘সুমধুর’ মেলবন্ধন করে চেতন বা অবচেতন মনেই আমরা আমাদের নীতিহীন রাজত্বে ‘ট্রাম্প’ হয়ে উঠি। কিন্তু এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হোক। হোক আমাদের আত্মশুদ্ধি।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এআই




মন্তব্য করুন: