‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ ও তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ এর এক মাস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৬ সালটি এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, সংগ্রাম এবং প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে অবশেষে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে এদেশের ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
The Guardian নামক ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত "Bangladesh Tarique Rahman sworn in as Bangladeshi prime minister" প্রবন্ধ মতে এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার সূচক হিসেবে, আবার কেউ কেউ একে এক কঠিন পরীক্ষার শুরু বলে মতামত দিয়েছেন।
ইতোমধ্য তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষের মতো নির্মোহ চলাফেরা, আচার-আচরণ এবং দায়িত্বের প্রতি পেশাদারিত্বের কিছু সুন্দর দৃষ্টান্ত জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার সময় সাধারণ নাগরিকদের মতো জ্যামে বসে থাকা, রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধে ব্যক্তিগত গাড়ি এবং জ্বালানি ব্যবহার কিংবা মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় বিধিমোতাবেক শহীদ মিনারের পাদদেশে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর একজন সাধারণ মুসলমানের মতোই শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করেন। তবে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এই কাজগুলো জনমানসে এক আশার আলো সঞ্চার করলেও তাঁর মূল পরীক্ষা মূলত নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিজ্ঞানামা এবং এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের যে অঙ্গীকার করেছে, দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় তার বেশ কিছু পূরণের পথে যাত্রা শুরু করেছে। বিশেষত, যে পরিবর্তনের আশায় এদেশের মানুষ তারেক রহমানকে নির্বাচিত করেছে, ইতোমধ্যেই সেই প্রত্যাশা পূরণের এক অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন তা সত্যিই আলোচনার দাবিদার।
প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস:
রাষ্ট্র্রীয় ব্যয়ে সংযমসাধন:
শপথ গ্রহণের দিনই তারেক রহমান ঘোষণা দিয়ে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট ভোগ না করার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি অপচয় রোধ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় লাঘব হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত।
কর্মক্ষেত্রে সময় এবং নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা:
তারেক রহমান সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও শনিবার অফিস করাসহ যথাসময়ে অফিসে পৌছানো এবং সরকারি কর্মকর্তাদেরও সকাল ৯টায় অফিসে আসা বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সময়ানুবর্তিতা এবং নিয়মানুবর্তিতার এক কঠিন তপস্যার সূচনা করেছেন।
ভিভিআইপি প্রটোকল ব্যবস্থার সংস্কার:
ভিআইপি গাড়ি চলাচলের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ অবস্থানের সংস্কার এবং প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সাধারণ নাগরিকদের মতো ট্রাফিক আইন মানার মাধ্যমে জনগণের মধ্যেও ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার এক উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
বিমানবন্দরের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ব্যবস্থার সংস্কার:
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতার জন্য শুধুমাত্র ০৪ জন ব্যক্তির যথা: একজন সিনিয়র মন্ত্রী, চিফ হুইপ, মন্ত্রীপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব-এর উপস্থিত থাকার প্রজ্ঞাপন জারি করেন তিনি।
অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উন্নয়ন:
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সরবরাহে ভারসাম্য রক্ষা:
রমজানে বাজার মনিটরিং এর মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ জনজীবনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতির অস্থিরতা প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটকে মোকাবেলা করতে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে স্পট এলএনজি ক্রয় করেন।
বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর পরিকল্পনা:
সরকারি শিল্পকারখানা পর্যায়ক্রমে চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ:
বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে ১০০কোটি টাকা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতকরণ:
শ্রমিকদের বকেয়া বেতনসহ সময়মতো বোনাস পরিশোধ এবং রপ্তানি বাণিজ্যকে প্রসারিত করতে ২৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ ঘোষণা করেছে সরকার।
ইকোনমিক জোনে নতুন সম্ভাবনার শুরু:
বিভিন্ন স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোনগুলোতে গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ব্যবসার উন্মোচন এবং স্হানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন জনাব তারেক রহমান।
সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ও অন্তর্ভুক্তক্তিমূলক কল্যাণ:
ফ্যামিলি কার্ড প্রদান:
জাতীয় নির্বাচনে প্রকাশিত ইশতেহার মোতাবেক দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও পেছনের সারির পরিবারগুলোর নারী সদস্যদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড একটি উদ্দেশ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যার মাধ্যমে এই পরিবারগুলোকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঈদের আগেই গত ১০ মার্চ থেকে পাইলট পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ টি নারী প্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। পর্যায়ক্রমে এই সেবা ২ কোটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছে সরকার। প্রতিটি নির্বাচিত পরিবারের নারী সদস্যের নামে প্রণীত এই কার্ডের ভিত্তিতে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ গৃহবধূ থেকে বয়স্ক নারী সদস্যের প্রত্যেকেই নিজ পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে এবং ক্রমান্বয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হবে।
উৎসবে মানবিক সহায়তা প্রদান:
সকল পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ঈদ উপহার প্রদানসহ অসহায় ও গরীবদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করা হয়।
ধর্মীয় সেবকদের রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন প্রদান:
দেশের ৪৯০৮ মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন, ৯৯০ মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪ বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ, ৩৯৬ গির্জার যাজকদের মধ্যে মাসিক ভাতা প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ধর্মীয় সেবার প্রতিও সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ -এই বার্তা জনগণের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থা স্থাপন:
দারিদ্রতা দূরীকরণে যাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আলেম-মাশায়েখদের সাথে আলোচনা করে এর প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন:
কৃষক কার্ড প্রদান এবং কৃষি ঋণ মওকুফ:
কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। কৃষকদের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ১২ লাখ কৃষকের দেড় হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করেছে সরকার এবং প্রায় ২৭০০০হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদানের কার্যক্রম অতিসত্বর চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। দেশের অর্থনীতির সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে এই উদ্যোগটি।
খাল খনন কর্মসূচি:
ইতোমধ্যে দেশের ৫৪টি জেলার ২০,০০০ (বিশ হাজার) কি.মি. খাল ও জলাশয় খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তারেক রহমান যার মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজের অগ্রগতি সাধন হবে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের পুনর্ভর্তি ফি ও লটারি বাতিল করে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারের প্রচলন, রাষ্ট্রীয় সহায়তায় শিক্ষার্থীদের জামানতবিহীন সর্বোচ্চ ১০লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যাবোধের উন্নয়নের জন্য প্রায় ৯০০০ শিক্ষক নিয়োগ; উপজেলা পর্যায়ে ১৮ জন ক্রীড়াশিক্ষক নিয়োগ , নতুন কুড়ি এবং কোরআান তেলওয়াত এর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের রূপরেখা দিয়েছে বর্তমান সরকার।
স্বাস্হ্যখাতকে জনকল্যাণমুখী করতে ই-হেলথ কার্ডের প্রচলনের মাধ্যমে প্রযুক্তি নির্ভর স্বাস্থ্য সেবা প্রদান; ১লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ৮০% নারীর নিয়োগের নিশ্চয়তা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। একইসাথে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা এবং নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নারী ড্রাইভার পরিচালিত শুধুমাত্র নারীদের জন্য পিংক বাসের প্রচলন এবং লোকাল ব্যবসা এবং জনজীবনকে নিরাপত্তা দিতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্হা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
একইসাথে পিলখানা হত্যা মামলার প্রেক্ষিতে ২৫ ফেব্রুয়ারিকে "শহীদ সেনা দিবস" ঘোষণা; রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ বজায় রাখতে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ইফতার আয়োজনে সংযম পালন এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারি কার্যালয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান, বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনালের দ্রুত উদ্বোধনের ঘোষণা এবং বিমানবন্দর ও চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান কর্তৃক গৃহীত আরো কিছু জনকল্যাণমুখী সেবা।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- Morning shows the day" সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসটিতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক গৃহীত এই উদ্যোগগুলো জনজীবনে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়-প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি, নৈতিকতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির সমন্বয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি গুড গভর্ন্যান্স এর মডেলরূপে প্রতিষ্ঠা করা। নিঃসন্দেহে, সুশাসন একদিনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না; এটি দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের ধারাবাহিক ও সমন্বিত প্রয়াসের ফল।
তবে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যখন নিয়মানুবর্তিতা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটান, তখন সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়। ছাত্র-জনতার ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উল্লিখিত এই উদ্যোগগুলো সেই ইতিবাচক পরিবর্তন আর সম্ভাবনার বাংলাদেশের ইঙ্গিত বহন করছে—যেখানে সরকার হবে জবাবদিহিমূলক, সমাজ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, আর প্রশাসন হবে জনগণের আস্থার প্রতীক।
লেখক: সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ এবং এম. ফিল শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: