• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা আদায় ওয়াজিব

ঈদে দামী নয়, সুন্দর, পরিষ্কার পোষাক পরা উত্তম

নাসির উদ্দিন

প্রকাশিত: ১২:২২, ২০ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ঈদে দামী নয়, সুন্দর, পরিষ্কার পোষাক পরা উত্তম

বিশ্বের প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব কিছু উৎসব রয়েছে। জাহেলি যুগেও আরব সমাজে ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে দুটি উৎসব প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য এর চেয়েও উত্তম দুটি উৎসব দান করেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুটি হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর মধ্যে প্রথমটি ঈদুল ফিতর, যার অর্থ “রোজা ভাঙার দিন”। একে পুরস্কারের দিনও বলা হয়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানরা ধর্মীয় কর্তব্য পালনের মাধ্যমে আনন্দঘন পরিবেশে এই দিনটি উদযাপন করে। অপরটি হলো ঈদুল আজহা, যা ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। নবী করিম (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে, আর আমাদের উৎসব হলো এই দুটি ঈদ।”

হাদিসে বর্ণিত আছে—একবার বাজারে বিক্রয়ের জন্য রাখা একটি রেশমি জুব্বা নিয়ে হজরত উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এটি কিনে নিন, ঈদ ও প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতের সময় পরিধান করবেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “এটি তাদের পোশাক, যাদের পরকালে কোনো অংশ নেই।” কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই উমর (রা.)-এর কাছে একটি রেশমি জুব্বা পাঠালেন। উমর (রা.) আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “তুমি এটি বিক্রি করে নিজের প্রয়োজন পূরণ করো।” এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামে দামী পোশাক নয়; বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক পরিধানই উত্তম।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয় দ্বিতীয় হিজরি বর্ষে, বদর যুদ্ধের বিজয়ের ১৩ দিন পর, ১ শাওয়ালে। একই বছরে ১০ জিলহজে ঈদুল আজহা পালিত হয়।

ঈদের নামাজ পুরুষদের জন্য ওয়াজিব। ফজরের নামাজের সময় শেষ হওয়ার পর সূর্যোদয়ের পর থেকে দিনের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করা যায়। এই নামাজের জন্য আজান বা ইকামত দেওয়া হয় না। সাধারণত ঈদুল আজহার নামাজ ঈদুল ফিতরের তুলনায় কিছুটা আগে আদায় করা হয়, কারণ পরে কোরবানি সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

রমজানের ঈদের নামাজের আগে কিছু খাওয়া এবং কোরবানির ঈদের নামাজের পরে খাওয়া সুন্নত। ঈদের নামাজ জামাতে আদায় করতে হয় এবং এতে দুই রাকাত নামাজের সঙ্গে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবির রয়েছে। জুমার নামাজের মতো আগে খুতবা না দিয়ে, ঈদের নামাজ শেষে খুতবা প্রদান করা হয়, যা শোনা মুসল্লিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদের দিন নামাজে যাওয়ার আগে খেজুর বা মিষ্টি কিছু খাওয়া উত্তম। এছাড়া গোসল করা, মিসওয়াক করা, আতর ব্যবহার করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং এক পথে গিয়ে অন্য পথে ফিরে আসা সুন্নত আমল। এসবের মাধ্যমে ঈদের দিনের সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বৃদ্ধি পায়।

রমজান মাসের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণের জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের নামাজের আগে ফিতরা প্রদান করাই উত্তম। সাধারণত গম, যব, কিসমিস বা খেজুরের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা তার মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা হয়। ফিতরা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরাই যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত।

এ বছর বাংলাদেশে জনপ্রতি ফিতরার হার সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা আদায় করা উচিত; ধনী ব্যক্তির জন্য সর্বনিম্ন হার যথেষ্ট নয়।

ঈদের আগের রাতকে বলা হয় ‘চাঁদ রাত’—এটি এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ রাত। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ উদযাপিত হয়। এই রাত ইবাদতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই তা বাজার-ঘোরাঘুরিতে কাটান। অথচ এটি আমলের এক মূল্যবান সময়।

হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজ আদায়ের পর মহিলাদের কাছে গিয়ে দান করার আহ্বান জানান। তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অলংকার দান করেন। এতে বোঝা যায়, ঈদ কেবল আনন্দের নয়; দান ও মানবিকতারও শিক্ষা দেয়।

ঈদের দিন প্রথমেই ফজরের নামাজ আদায় করতে হয়। এরপর গোসল করে পরিচ্ছন্ন হয়ে ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করা উচিত। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে, শুভেচ্ছা বিনিময় করে। সালামি দেওয়া একটি সামাজিক রীতি হলেও এর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।

একবার ঈদের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি এতিম শিশুকে কাঁদতে দেখে তাকে সান্ত্বনা দেন এবং নিজের পরিবারে স্থান দেন। এই ঘটনা আমাদের শেখায়—ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করা, বিশেষ করে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদের দিনে সেমাইসহ নানা রকম খাবার তৈরি করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া একটি প্রচলিত রীতি। তবে খাবারে ভেজালের বিষয়টি মাথায় রেখে সংযমী হওয়াই ভালো।

সবশেষে, ঈদের মূল শিক্ষা হলো আনন্দ, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ। তাই আমরা সবাই একে অপরকে বলি—
“ঈদ মোবারক”।

মন্তব্য করুন: