• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মক্কার আকাশে সাইরেন, এ কি শুধু সতর্কসংকেত?

শহিদুল ইসলাম কবির

প্রকাশিত: ১৪:১৬, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
মক্কার আকাশে সাইরেন, এ কি শুধু সতর্কসংকেত?

মক্কা মুকাররমা—মুসলমানের হৃদয়ের শহর। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা একজন মুসলমান যখন নামাজে দাঁড়ান, তাঁর মুখ ফিরে যায় এই পবিত্র নগরীর দিকে। কাবা শরিফ শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ঈমান ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম কেন্দ্র। 

সেই মক্কার আকাশে যদি হঠাৎ বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে, তা কি কেবল একটি নিরাপত্তা সতর্কতা? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো বার্তা?

১৫ সেপ্টেম্বর মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে সম্ভাব্য আকাশপথের হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ মক্কার দক্ষিণে একটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ হুতিরা অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনার দায় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

কিন্তু মক্কার আকাশে সাইরেন বেজেছে—এই বাস্তবতাই যথেষ্ট উদ্বেগের।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক বিচারপতি মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ঘটনাটিকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলারও তিনি নিন্দা জানিয়েছেন। তার এই উদ্বেগ শুধু একজন আলেমের ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি।

মক্কা কোনো যুদ্ধের ময়দান নয়: রাজনীতি থাকবে, রাষ্ট্রের স্বার্থ থাকবে, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকবে—কিন্তু পবিত্র নগরীগুলোকে কি এসব সংঘাতের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া যায়?

যুদ্ধের আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষেপণাস্ত্র কোনো ধর্ম, বয়স বা জাতীয়তা দেখে না। তার সবচেয়ে অসহায় শিকার হয় সাধারণ মানুষ। আর মক্কার মতো পবিত্র নগরী যদি সংঘাতের ছায়ায় পড়ে, তার অভিঘাত শুধু একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আঘাত হানে।

আজ মুসলিম বিশ্বের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উত্তেজনা নয়—দায়িত্বশীলতা। প্রতিশোধ নয়—শান্তি। বিভাজন নয়—ঐক্য।

সাইরেন থেমেছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে: সাইরেনের শব্দ হয়তো কয়েক মিনিট পর থেমে যায়। কিন্তু যে প্রশ্নটি রেখে যায়, সেটি এত সহজে থামে না।

মুসলিম বিশ্বের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কি আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন নয়? রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কি মক্কা-মদিনার নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাই এক কণ্ঠ হতে পারে না?

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু ঐক্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে সংকটের সময়। আজ প্রয়োজন সেই পরীক্ষায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া।

মক্কার আকাশে বাজা সাইরেনকে তাই কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার উপলক্ষ—কেন মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও আমাদের উদ্বিগ্ন হতে হবে?

মক্কার নিরাপত্তা মানে শুধু একটি নগরীর নিরাপত্তা নয়; এটি কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের নিরাপত্তা।

তাই আমাদের প্রত্যাশা—পবিত্র মক্কা ও মদিনা সব ধরনের সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকুক। সৌদি আরবসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। নিরপরাধ মানুষের জীবন ও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক।

মক্কার আকাশে যে সাইরেন বেজেছে, তার শব্দ হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর বিবেকের দরজায় যে কড়া নাড়ার শব্দ উঠেছে—সেটি যেন আমরা উপেক্ষা না করি।

লেখক: শহিদুল ইসলাম কবির 
সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল 

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন: