• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২

রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পে অপার সম্ভাবনা 

 সোহেল রানা মনির 

প্রকাশিত: ১৪:০৫, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

আপডেট: ১৪:০৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

ফন্ট সাইজ
রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পে অপার সম্ভাবনা 

আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। নতুন উদ্ভাবিত আধুনিক পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ, উন্নত কৃষি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, কম খরচে ফসলের উৎপাদন এবং নিবিড়তা বাড়ানো এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়াও নিরাপদ উচ্চ মূল্যের ফসল উৎপাদন, দ্রুত পচনশীল উচ্চমূল্যের ফসলের সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লাভজনক মূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষকের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, পুষ্টি মান উন্নয়ন, দারিদ্য দূরীকরণ এবং টেকসই কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে প্রকল্পটি।

ব্রি ও বিনা উদ্ভাবিত মোটা, সুগন্ধী, সরু চাল, জিংক সমৃদ্ধ চাল, স¦ল্প জীবনকাল সম্পন্ন ও স্থানীয় উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত সম্প্রসারণ ২৮৮১টি। বারি উদ্ভাবিত গমের জাত সম্প্রসারণ ২০১০টি। হাইব্রিড ভুট্রা চাষ সম্প্রসারণ ২০১০টি। বারি উদ্ভাবিত রিলে পদ্ধতিতে ফসল চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ১৩৪০টি। বারি উদ্ভাবিত নতুন ফসল বিন্যাস প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ১০০৫টি। বারি উদ্ভাবিত আন্তঃ/মিশ্র ফসল চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ২০১০টি। বারি ও বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল তেল জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ ৬৭০টি। বারি ও বিনা উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ডাল জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ-৬৭০টি। বারি ও বিনা উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল মশলা জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ ১০০৫টি। নিরাপদ উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ-২০১০টি  এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

পুষ্টি চাহিদা পূরণে নতুন প্রযুক্তি দ্বারা ফল বাগান স্থাপন ৬৭০টি। ঘন মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৩৩৫টি। কমিউনিটি সবজি বীজতলা সম্প্রসারণ ৩৩৫টি। পুরাতন ফল বাগান পরিচর্যার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৬৭০টি। পুষ্টি প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপন ৮০টি। টপ ওয়ার্কিং এর মাধ্যমে জাত উন্নয়ন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ১০০৫টি। ডোবার/পুকুর পাড় ও নদীর চরে ফসল চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৩৩৫টি। বসতবাড়ীতে সবজি চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৩৩৫০ টি। ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৬৭০টি। বারি উদ্ভাবিত মালচিং প্রয়োগের মাধম্যে ফসল চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ১৩৪০টি। শুকনো পদ্ধতিতে ধান চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৩৩৫টি। লাক্ষা চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ২৫টি। পিভিসি পাইপ ও চেক ভাল প্রযুক্তি দ্বারা পানি সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ৩৩৫টির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে কৃষকদেরকে।

সরেজমিনে প্রকল্পভূক্ত এলাকাসমূহের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সুফলভোগীর বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, ২০ দিন বয়সের চারা ব্যবহার করে ১০৫ দিনেই ব্রি ধান ঘরে তুলতে পেরে উৎফুল্ল কৃষকরা। সরিষা চাষেও ব্যাপক লাভবান হয়েছেন অনেকে। ফলে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অন্যদেরও উৎসাহিত করছে।

রাজশাহী জেলার নিতপুর উপজেলার নিতপুর ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামের আব্দুল হক জানান, আমি একজন দরিদ্র চাষী, প্রতি বছরই রোপা আমনে স্বর্ণা ধান চাষ করি। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রদর্শনী পেয়ে আমি গত ৩ বছর থেকে ব্রি ধান-৭৫ জাতের বীজ নিয়ে ধান চাষ করি এবং অন্যদের চাষ করতে উৎসাহ দিয়ে থাকি। মাঠ পরীক্ষার ফলাফলে দেখতে পেয়েছি ২০ দিনের বয়সের চারা ব্যবহার করে ১০৫ দিনেই ব্রি ধান-৭৫ কর্তন করা যায়। যার ফলন হেক্টর প্রতি ৫.৪ টনের অধিক হয়েছে। এই জাতটি অন্যান্য উচ্চফলনশীল ও দীর্ঘ মেয়াদী জাতের তুলনায় আগাম উচ্চ ফলন দিতে পারে। আগাম পরিপক্কতার কারণে আমি সহজে এবং সময়মত সরিষাসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের শীতকালীন ফসল চাষ করতে পারি। এছাড়াও আগাম পরিপক্কতার কারণে বাদামী গাছ ফড়িং/কারেন্ট পোকার আক্রমণ কম হয়। এই জাতীয় ফসল শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। বর্তমানে তেলের বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে সরিষা চাষেও লাভবান হয়েছি। সরিষা কর্তন শেষে একই জমিতে সঠিক সময়ে বোরো ধান চাষ করতে পারি।

আব্দুল হক আরো বলেন, আমি এ জাতের আগাম ফসল এবং ফলন দেখে খুবই খুশি। এটি ধানের পাশাপাশি খড়ের উচ্চমূল্য পেতে অনেক সাহায্য করে। এ জাতের ধান যে সময় পরিপক্ক হয় সে সময় অন্য জাতের ধান সবুজ থাকে। তাই সে সময়ে খড়ের মূল্য বা চাহিদা বেশি থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমি গত তিন বছর যাবত এই ব্রি ধান-৭৫ জাতের ধান চাষ করে অনেক সফলতা অর্জন করেছি। এ জাতের ধান লাগানোর পর থেকে এক ধরনের সুগন্ধি ছড়িয়ে থাকে। সুগন্ধি পেয়ে অনেক চাষির নিকট আমি ধানের বীজ হিসেবে বেশি মূল্যে বিক্রি করতে পারি। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্র্শ মোতাবেক আমি তিন বছর ব্রি ধান-৭৫ জাতের ধান চাষ করি পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জমিতে স্বর্ণা ধান চাষ করেছিলাম এতে দেখা যায় স্বর্ণা ধানের চেয়ে কমপক্ষে ২৫-৩০ দিন আগেই ধান কর্তন করেছি। যাহা আর্থিক ও সময়ের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধাজনক। রোপা আমন মৌসুমে অনাবৃষ্টির কারণে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হয়, সেসময় আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন থাকার কারণে জমিতে কারেন্ট পোকার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। কিন্তু এই ব্রি ধান -৭৫ আগাম জাত হওয়ার জন্য সম্পূরক সেচ প্রয়োজন হয় নাই এবং কারেন্ট পোকা ধান ক্ষেতে লাগে নাই। এতে পানি সেচ ও পোকা দমনে অতিরিক্ত কোন অর্থ খরচ করতে হয় নাই। অথচ স্বর্ণা ধানে সম্পূরক অতিরিক্ত সেচ প্রদান ও কারেন্ট পোকা আক্রমণে পানি সেচে এবং পোকা দমনে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেছি।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. এস.এম. হাসানুজ্জামান বলেন, প্রকল্পভূক্ত এলাকার কৃষকদের মাঝে ৭০% ভর্তুকি মূল্যে আন্তঃপরিচর্যার গার্ডেন টিলার, ফুট পাম্প স্প্রেয়ার, পাওয়ার উইডার , ধান, গম, মসুর, সরিষা, পাট, পেয়াঁজ, বিএআরআই উদ্ভাবিত সিডার, বেড প্লান্টার যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই করতে কর্ন সেলার যন্ত্র এবং পটেটো হারভেস্ট করতে পটেটো ডিগার যন্ত্র গাইডলাইন অনুযায়ী বিতরণ করা হবে। 

মন্তব্য করুন: