মুক্তিযুদ্ধ, ফুটবল মাঠ, তারপর রাজনীতি: যেভাবে স্পিকার হলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য। ভোলা-৩ আসন থেকে তিনি পরপর ৬ মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৯৪৪ সালে পৈতৃক বাড়ি ভোলার লালমোহনে। তার বাবার নাম আজাহার উদ্দিন আহম্মদ পেশায় তিনি চিকিৎসক ছিলেন, হাফিজ উদ্দিনের মায়ের নাম করিমুন্নেছা। হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৬১ সালে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে ১৯৬৮ সালে কমিশন পান এবং প্রথম কর্মরত ছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালের মার্চে হাফিজ উদ্দিন তার ইউনিটের সঙ্গে যশোরের প্রত্যন্ত এলাকা জগদীশপুরে শীতকালীন প্রশিক্ষণে ছিলেন। পরে ২৯ মার্চ তারা সেনানিবাসে ফেরেন এবং পরে যোগ দেন যুদ্ধে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ শেষ করে ভারতে যান। তিনি কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজের যুদ্ধে বেশ ভূমিকা রাখেন।স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন।
ক্রিড়া ব্যক্তিত্ব হিসাবেও তার যথেষ্ঠ খ্যাতি রয়েছে। তিনি ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়ার হিসেবে বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়কও ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় ঢাকা মোহামেডান স্পাের্টিং ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়কত্ব করেন। ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন এবং ফিফা’র আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ভোলা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়যক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনা, ক্রীড়া অঙ্গনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা, ক্রীড়া ও রাজনীতিতে তার অবদান আজও অনুপ্রেরণা জোগায় নতুন প্রজন্মকে। বীর বিক্রম খেতাবধারী এই নেতার নতুন পথচলা বাংলাদেশের সংগ্রাম ও সাফল্যেরই এক গর্বিত প্রতিচ্ছবি।
বিভি/এসআই



মন্তব্য করুন: