১৪ই ডিসেম্বর কেবলই একটি তারিখ?
বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক ভয়ংকর কালো অধ্যায় হলো ১৪ই ডিসেম্বর। এই নির্মম, নৃশংস হত্যাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ মূলত এ দিনটি বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ১৯৭১ সালে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ও মহান বিজয়ের প্রক্কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সাথে এদেশীয় স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল বদর, আল শামস, শান্তিকমটি ও নেজামে ইসলামের দালালরা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে দেশের সূর্য সন্তান, জাতির ম্যাগনেট বুদ্ধিজীবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পূর্বের নীল নকশা অনুযায়ী হত্যা করে। সেই তালিকায় ছিল বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিক। যাদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে।
পরবর্তীতে ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবর চিহ্নিত হয়। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে আজকের এ দিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা এই নৃশংস হত্যাযোগ্য চালায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের উপসংহারে এসে পাকিস্তানি পশুরা উপলব্ধি করেন বাঙালি জাতির অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
স্বাধীন বাংলাদেশ যাতে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের ভূখণ্ডের চিএাংকন করতে ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত রাষ্ট্র থেকে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ যাতে গড়ে তুলতে না পারে সে কারণে নৃশংসভাবে বুদ্ধিজীবী হতা শুরু করে। এর মূল কারণ ছিল, বুদ্ধিজীবীরা যাতে তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষনতা, দুরদর্শিতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই সোনার বাংলাকে দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়।
২য় বিশ্বযুদ্ধ অর্থাৎ ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের পর থেকে এরূপ ভয়াবহ হত্যাকান্ড পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাপিডিয়ার মতে, ১১১১জন বুদ্ধিজীবী এ নির্মম হত্যাকােণ্ডর শিকার হন যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, বিশেষত যেসব বুদ্ধিজীবীদের নাম না বললেই নয় তারা হলেন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জোতির্ময় গুহঠাকুরতা, রাশীদুল হাসান, ড. আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, সেলিনা পারভিন প্রমুখ।
এসকল বুদ্ধিজীবীরা নিরলস পরিশ্রম ও সাধনা করেছেন কেবলমাত্র একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যাতে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকদের ভয়াল থাবার কবল থেকে মুক্ত হয়ে সাম্য, ভ্রাতৃত্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার সহিত বেঁচে থাকতে পারে সেটাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে। দেশের শেষ্ঠ সন্তানেরা নিজের সোনালি জীবন উৎসর্গ করেছেন একটি মাত্র স্বাধীন সূর্যের আশায় সেটা হলো বর্তমান বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশের দুরাবস্থা সারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তাদের অবদান অতুলনীয়। এছাড়াও দেশের মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে, উদ্বদ্ধ করতে, দেশকে শত্রুর কালো থাবা থেকে রক্ষার জন্য এসকল বুদ্ধিজীবীরা কবিতা, ছোটগল্প, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সংবাদ, গান অর্থাৎ সাহিত্যের সর্বস্তরে আত্মনিয়োগ করেছেন। ফলস্বরূপ, তারা পাক হানাদার বাহিনীর অসহনীয় অত্যাচার, নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত এসকল বুদ্ধিজীবীরা বাংলার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার বিনিময়ে নিজেদের তাজা প্রাণকে অকাতরে উৎসর্গ করেছেন। বুদ্ধিজীবীদের মহান আত্মত্যাগের স্মরণে মনে পড়ে গোবিন্দ হালদারের সেই বিখ্যাত গান - "মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি"।
এই বাঙালি জাতি আজীবন দেশের এসব সূর্যসন্তানদের কাছে ঋণী এবং চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, আজ পশ্চিমা অপসংস্কৃতির প্রভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকরা স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলে যেতে বসেছে, ভুলে যাচ্ছে দেশের স্বাধীনতার বিনিময়ে প্রাণ উৎসর্গকারী শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
স্বাধীন বাংলাদেশ ৫১তম বছরে পদার্পণ করলেও সাধারণ মানুষ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি, পারেনি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে, বাস্তবায়িত হয়নি ৩০লক্ষ শহিদ এবং ২লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য। দুর্ভাগ্যবশত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে তরুনদের মাঝে স্বাধীনতার আদর্শ ও চেতনা প্রতিফলিত করতে।
পাকিস্তানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এদেশের বুদ্ধিজীবীরা জোরালো কন্ঠে প্রতিবাদ করেেছন, জতিকে দেখিয়েছেন সুপথ। অথচ স্বাধীনতার ৫১ বছর বয়সে পদার্পণ করেও জাতি সেই মেধাশূন্যতার মাশুল দিচ্ছে। তবে বাঙালি জাতির জন্য স্বস্তির বিষয় এই যে, বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি আংশিক কার্যকর হয়েছে।
আজকের এই মহান আত্মতাগের দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। মহান বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে যদি আমরা তাদের চিন্তা ও চেতনাকে ধারণ করতে পারি এবং তাদের অধরা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারি। সর্বোপরি, তাদের আদর্শই হোক আমাদের জীবন চলার পাথেয়।
লেখক: মো. জাহিদ
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: