• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে শীতের থাবা

চিকিৎসকহীন ক্লিনিক, কম্বলহীন চর—কে শুনবে আর্তনাদ?

শফিকুল ইসলাম বেবু, কুড়িগ্রাম 

প্রকাশিত: ১৪:৩৭, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

ফন্ট সাইজ
চিকিৎসকহীন ক্লিনিক, কম্বলহীন চর—কে শুনবে আর্তনাদ?

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে শীত এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগ নয়—এটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। শনিবার রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, বাতাসের আর্দ্রতা ৯৯ শতাংশ। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষ।

জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৪৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এদের অধিকাংশই দিনমজুর, জেলে ও কৃষিশ্রমিক। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমে গেছে, অনেকের আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দারিদ্র্য আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
চর রাজিবপুর উপজেলা 

চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান জানান, পুরো উপজেলা ব্রহ্মপুত্র, কালজানি ও জিঞ্জিরাম নদীর ধারায় বিচ্ছিন্ন। উপজেলায় প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ বসবাস করে, যার মধ্যে ২৯টি চরের মানুষ শীতে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। শীতবস্ত্রের অভাব চরমে পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, মোহনগঞ্জ, কোদালকাটি ও চর রাজিবপুর—এই তিনটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা বলতে কার্যত কিছুই নেই। কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও চিকিৎসক ও ওষুধ পাওয়া যায় না। জরুরি ভিত্তিতে শীতবস্ত্র ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটবে।

কোদালকাটি ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মাজেদা খাতুন বলেন, তাঁর ইউনিয়নের মানুষ শীতে ভয়াবহ কষ্টে আছে। অথচ তিনি শীতার্ত মানুষের জন্য মাত্র ২০টি কম্বল পেয়েছেন। এত কম কম্বল দিয়ে কীভাবে মানুষকে সামাল দেবেন—তা নিয়েই তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, তাঁর ইউনিয়নে মোট ৩৬ হাজার মানুষের মধ্যে চরাঞ্চলে বসবাস করে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ। অথচ তারা পেয়েছেন মাত্র ১০০টি কম্বল।

একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কালির আলগা চরের ইউপি সদস্য হোসেন আলী জানান, তাঁর চরে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসবাস করে। কিন্তু তিনি শুনেছেন, তাঁর ওয়ার্ডে মাত্র চারটি কম্বল দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য চারটি কম্বল বিতরণ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এছাড়া চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরের ভাষ্যমতে—৮ নম্বর ওয়ার্ড গোয়াইলপুরী চরে ৬টি, ৯ নম্বর ওয়ার্ড ঝুনকার চরে ৭টি এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ড পার্বতীপুর চরে ৬টি কম্বল বিতরণ বরাদ্দ  করা হয়েছে।

এদিকে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, জেলায় ২৯৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নন কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। তিনি বলেন, সিভিল সার্জনের দেওয়া পরিসংখ্যান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চরাঞ্চলের ইউপি সদস্যদের বক্তব্যই প্রমাণ করে—স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অনুপস্থিত।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকাচর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রায়হান কবির জানান, তাঁর এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সাধারণ মানুষ চিকিৎসক বা কর্মচারীদের চেনে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ক্লিনিকের চিকিৎসক আব্দুল আউয়াল নিয়মিত চিকিৎসা দেন না। শুধু ঝুনকারচর নয়, ভগবতীপুরসহ জেলার অধিকাংশ চরাঞ্চলের ক্লিনিকগুলোতেও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, সরকার থেকে ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দে ১৩ হাজার, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে সাড়ে ৭ হাজার, পূর্বের ১ হাজার ৫০০সহ মোট ২২ হাজার কম্বল জেলার ৯ উপজেলায় ৭৩টি ইউনিয়নে বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত ৮০ হাজার কম্বল বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র পাঠানো হয়েছে।

চরবাসীদের অভিযোগ—সহায়তার পরিসংখ্যান থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি নগণ্য। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে শীতজনিত এই সংকট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: