সেই সাকিনা বেগমকে ভারতে ফেরানোর পথ কী?
বিকাল পাঁচটা, নিভে আসছে দিনের আলো। গাজীপুরে কাশিমপুর কারাগারের গেট খুলে গেলো। একজন কারারক্ষীর সঙ্গে বাইরে বের হয়ে এলেন সাকিনা বেগম। তবে মুক্তি পেয়েও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি।
একটা ছোটো ব্যাগ হাতে, পায়ে স্যান্ডেল আর পুরোনো শাড়ি পরা সাকিনা বেগমকে কারাফটকে রিসিভ করলেন এর আগে তাকে মিরপুরে যে পরিবারটি আশ্রয় দিয়েছিলো, সেই পরিবারের দুইজন নারী সদস্য।
সাকিনা বেগম তখনো যেন ঘোরের মধ্যে। চোখে কিছুটা ভীত দৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত যখন বুঝতে পারলেন সত্যিই ছাড়া পেয়েছেন তখনই ফুঁপিয়ে কাঁদা শুরু হলো তার।
"নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম যেন আমার জামিন হয়। আল্লাহকে বলছিলাম, জজ সাহেবের মনটা ঘুরায় দেও। আমার যেন জামিন হয়," কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন সাকিনা বেগম।
এই নারী ভারতের আসামের বাসিন্দা। আসাম পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিলো গত মে মাসের শেষের দিকে। আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী তিনি একজন 'বিদেশি'। যে আদেশ পরে বহাল রেখেছিলো গুয়াহাটি হাইকোর্টও।
কিন্তু গত মে মাসে আসাম পুলিশ তাকে গ্রেফতারের পর নিজস্ব হেফাজতে না রেখে হস্তান্তর করে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে। এসবের কিছুই জানানো হয়নি তার পরিবারকে।
গত সেপ্টেম্বরে সাকিনা বেগমকে বাংলাদেশের ঢাকার মিরপুরে খুঁজে পায় বিবিসি। ৬৮ বছরের এই নারী তখন জানিয়েছিলেন, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাকে সীমান্তের এপারে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে।
ভারত থেকে পুশইনের শিকার এই বৃদ্ধার ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করে বিবিসি বাংলা। তার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী ভারতে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালী আসামে গিয়ে সাকিনা বেগমের পরিবারকে খুঁজে পান।
কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয় মিরপুরের ভাষানটেক থানা পুলিশ।
যেহেতু সাকিনা বেগমের কাছে পাসপোর্ট নেই, বৈধভাবে প্রবেশের কোনো নথিপত্রও তিনি দেখাতে পারেননি, ফলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা দেয় পুলিশ।
পরদিন আদালতে তোলা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। শুরু হয় সাকিনা বেগমের জেল জীবন।
গত রোববার সেই মামলাতেই জামিন পাওয়ার পর সোমবার কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি, শেষ হয় তার বন্দিদশার।
সাকিনা বেগমের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রহমাতুল্যাহ সিদ্দিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, দুই শর্তে আদালত তাকে জামিন দিয়েছে।
"সাকিনা বেগম এর আগে মিরপুরে যে পরিবারের আশ্রয়ে ছিলেন, সেই পরিবারের দুই সদস্যের জিম্মায় তাকে জামিন দিয়েছে। এক্ষেত্রে ভাসানটেক থানা প্রতি সাত দিন পরপর ওই পরিবারে সাকিনা বেগমের অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়ে আদালতকে জানাবে," বলেন রহমাতুল্যাহ সিদ্দিক।
কিন্তু বাংলাদেশে জামিন পেলেও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে–– সাকিনা বেগম ভারতে কীভাবে ফিরবেন?
যদিও খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, সাকিনা বেগমের পরিবার তাকে ফেরাতে ভারতের আদালতে মামলা করেছেন।
'মেয়েকে ফোন করতে পারবো?'
কাশিমপুর কারাগার থেকে যখন গত সোমবার সাকিনা বেগম বের হলেন তখন তার কাছে প্রশ্ন ছিল, তার বাড়ি তো ভারতের আসামে, এখন তিনি বাংলাদেশে কোথায় ও কার কাছে যাবেন?
পাশে থাকা মিরপুরের জাকিয়া আক্তারকে দেখিয়ে সাকিনা বেগমের অকপট উত্তর, "ওর বাড়িতে যাবো। সে তো আমাকে মাসি ডাকে। সেই এখন আমার ভাতিজি। তার বাড়িতেই যাবো।"
এটুকু বলার পরই আসামে থাকা তার পরিবারের কথা মনে করে কাঁদতে থাকেন তিনি। এরপর জানতে চান, আসামে তার মেয়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে কি-না।
"মেয়েকে কি ফোন করতে পারবো?" প্রশ্ন করেন তিনি। কিন্তু তাৎক্ষণিক সে সুযোগ ছিল না।
পরদিন ভারতে বিবিসি বাংলার সংবাদদদাতা অমিতাভ ভট্টশালীর মাধ্যমে সাকিনা বেগমের কথা হয় তার ছেলে, মেয়ে ও পরিবারের সঙ্গে।
"মুই অখামোত যাম বাবা" অসমীয়া ভাষায় বারবার শুধু এটাই বলতে থাকেন সাকিনা বেগম, যার অর্থ 'আমি আসামে যাবো বাবা'।
ভারতে আইনি লড়াইয়ে সাকিনা বেগমের ছেলে
এদিকে ভারতে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালী জানিয়েছেন, সাকিনা বেগমের পরিবার গুয়াহাটি হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক ভুঁইঞ্যা বিবিসিকে জানান, মামলায় দুটি আবেদন করা হয়েছে।
এক. সাকিনা বেগমকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আগে তাকে যে আসাম পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো সেটা অবৈধ ঘোষণা করা হোক।
দুই. তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হোক।
"প্রথমত, তাকে সশরীরে আদালতের সামনে হাজির করতে হবে – কারণ তার আটক করা ও হেফাজতে রাখার পদ্ধতি আপাতভাবে বেআইনি; এবং যেভাবে তাকে পুশ ব্যাক করা হয়েছে – সেই প্রক্রিয়ার কোনো নীতিগত, আইনগত এবং সংবিধানসম্মত ছাড়পত্র নেই," বলছিলেন আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক ভুঁইঞ্যা।
এছাড়া একজন ব্যক্তিকে 'নিঃসন্দেহে' প্রত্যর্পণ করা যেতে পারে।
"কিন্তু এই প্রত্যর্পনের যে নীতি সেটাও এক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়নি। কারণ সন্দেহজনক বা ঘোষিত বিদেশিকে প্রত্যর্পনের যে নীতিমালা আছে, আসাম সরকার সেটাও মেনে চলেনি," বলেন তিনি।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের এই আইনজীবী জানান, মামলায় একইসঙ্গে আবেদন করা হয়েছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের হাই কমিশনারের দফতরের সহায়তা নিয়ে যাতে সাকিনা বেগমকে আদালতে হাজির করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, সাকিনা বেগমকে আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল আগেই ২০১২ সালে বিদেশি বলে ঘোষণা করেছিলো। পরে সেই একই রায় বজায় রাখে দেশটির গুয়াহাটি হাইকোর্টও।
এরপর সাকিনা বেগমকে বিদেশিদের জন্য আটক শিবিরেও বন্দি করে রাখা হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর। করোনার সময়ে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
পরে গত মে মাসে তাকে আবারও আটক করে বিএসএফের কাছে তুলে দেওয়া হয় বলে হাইকোর্টে জানিয়েছিল আসামের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কিন্তু এরপর বিএসএফের হাত থেকে কীভাবে সাকিনা বেগমকে বাংলাদেশে পাওয়া গেলো সে বিষয়ে যোগাযোগ করেও সেসময় বিএসএফের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিভি/এজেড




মন্তব্য করুন: