ছোট উদ্যোগ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পেলো কাকতাড়ুয়া
ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন আব্দুল্লাহ আল ইমরান। তবে অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে সরাসরি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করতে কিছুটা সংকোচ ছিল তার। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্তদাতা খোঁজাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম দেখে বুঝতে পারেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় সরাসরি উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। অনলাইনেও করা যায় মানবিক কাজ।
প্রযুক্তির প্রতি নিজের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে পরিচিতদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন তিনি। সেই ছোট উদ্যোগই একসময় রূপ নেয় ডিজিটাল নিরাপত্তাবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘কাকতাড়ুয়া’য়। অনলাইনে নিরাপত্তা ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে এবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন এই তরুণ। ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন তিনি।
পটুয়াখালীতে জন্ম নেওয়া ইমরানের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম, ঢাকা ও গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টে। সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাবার বদলির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে রাজেন্দ্রপুরে চলে যান তিনি। সেখানেই শেষ করেন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা। পরে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বর্তমানে নিজের প্রতিষ্ঠান প্রোবফ্লাই আইটির মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন ব্র্যান্ড সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছেন।
ইমরানের সামাজিক উদ্যোগ কাকতাড়ুয়ার যাত্রা শুরু হয় শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, ‘এক্সপোজ’ পোস্ট কিংবা ‘ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন’ পেজের মাধ্যমে কাউকে হেনস্তা করার প্রবণতা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ শুরু করেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিধিও বাড়ে। ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন প্রতারণা ও অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের মতো সমস্যায় পড়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সহায়তা দিতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
ইমরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাকতাড়ুয়ার বিনা মূল্যের অনলাইন কোর্সে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ নারী। পাঁচটি স্কুলে সরাসরি সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দুই থেকে তিন হাজার শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন তারা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন টুল ব্যবহার করেছেন আনুমানিক চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ। এসব টুলের মাধ্যমে সন্দেহজনক লিংক, তথ্য ফাঁস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্ট যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি অবশ্য সংখ্যার হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়। ইমরান জানান, ফিশিং নিয়ে তাদের তৈরি ভিডিও দেখে সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন অনেকেই। আবার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এক নারীকে অনলাইন থেকে সেই কনটেন্ট অপসারণে সহায়তা করেছেন তারা। পরবর্তী সময়ে ওই নারীর পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ধন্যবাদবার্তা তার কাছে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে।
ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড অর্জনকে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন ইমরান। তার ভাষায়, ‘পুরস্কারে আমার নাম থাকলেও এটি পুরো কাকতাড়ুয়া টিমের অর্জন। যাঁরা আমাদের ওপর ভরসা করে সাহায্য চেয়েছেন, তারাও এই অর্জনের অংশ।’
আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে মানুষের কাছে ডিজিটাল নিরাপত্তাসেবা পৌঁছে দিতে চান এই তরুণ উদ্যোক্তা। এ জন্য এআই-সহায়ক টুল ও অটোমেশন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাকতাড়ুয়ার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: